· Civil

বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ

বাংলাদেশের বর্তমান আইনব্যবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। প্রাচীন হিন্দু আইন, মুসলিম শাসনামলের ইসলামি আইন ও প্রথা, ব্রিটিশ আমলের Common Law, পাকিস্তান আমলের আইন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান—এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান আইনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসেও এই বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ
তার আগে বলে রাখা ভাল বাংলাদেশে এ যাবত প্রায় ১২০০ টি আইন প্রচলিত রয়েছে । যার মধ্যে ৩৬৬ টি আইন স্বাধীনতার পূর্বে বাকী আইনসমূহ স্বাধীনতার পরে পাশ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি করা হয়েছে বাংলাদেশ কোডের তথ্যের ভিত্তিতে- যেখানে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পাশকরা ৯৫৭টি আইন এবং ২০০৭ সাল পর্যন্ত পাশ করা ৪২ টি আইন রয়েছে। এবং ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল একাধিক আইন পাশ করা হয়েছে। এর কিছু আইন প্রায়ই সংশোধন , সংস্কার ও সময়োপযোগী করে প্রকাশিত করা হয়। বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশের পর্যায়গুলোকে সহজে ৫টি ধাপে ভাগ করা যায়। হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ, ব্রিটিশ যুগ, পাকিস্তান আমল ও সবশেষে বাংলাদেশ আমলগ ১. প্রাচীন হিন্দু আমল বা হিন্দু যুগ এ যুগের ব্যাপ্তি ছিল খ্রীষ্ট জন্মের পূর্বে ও পরে প্রায় ১৫০০ বছর। বাংলার প্রাচীন সমাজে আইন মূলত ধর্ম, প্রথা ও রাজশাসনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মনুস্মৃতি, ধর্মশাস্ত্র, স্মৃতি, পুরাণ প্রভৃতি আইন ও সামাজিক আচরণের নির্দেশনা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রাজাই ছিলেন সর্বোচ্চ বিচারিক কর্তৃপক্ষ। তবে এই সময়ের আইন আধুনিক অর্থে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রণীত ও সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য আইন ছিল না; সামাজিক ও বর্ণভেদও বিচারব্যবস্থায় প্রভাব ফেলত। ২. মুসলিম শাসনামল ১১০০ শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশে তুর্কি মুসলিমদের অধিক্রমনের সময় থেকে মুসলিম যুগের সূচনা হয়। মুসলিম যুগকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়। ১২০৬-১৫৫৬খ্রীঃ পর্যন্ত ৩০০ বছর সময়কাল সুলতানি আমল। আর ১৫২৬-১৮৫৭ খ্রীঃ মুঘল আমল। সুলতান যুগের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ঘুরি। মুগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইসলামি আইন বা শরিয়াহ বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। কাজী, মুফতি ও অন্যান্য বিচারিক কর্মকর্তার মাধ্যমে বিচারকার্য পরিচালিত হতো। ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিষয়ে ইসলামি আইন, স্থানীয় রীতি-নীতি এবং শাসকের নির্দেশ—সব মিলিয়ে বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হতো। ফতোয়া-ই-আলমগীরীসহ বিভিন্ন আইনগ্রন্থ এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ৩. ব্রিটিশ আমল—আধুনিক আইনব্যবস্থার ভিত্তি বাংলাদেশের বর্তমান আইনব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ে ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৭২৬ সালের Charter-এর মাধ্যমে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে ব্রিটিশ ধাঁচের বিচারব্যবস্থার সূচনা হয়। এরপর Regulating Act, 1773 এবং ১৭৭৪ সালে কলকাতার Fort William-এ Supreme Court of Judicature প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে Indian High Courts Act, 1861-এর মাধ্যমে Supreme Courts বিলুপ্ত করে High Court প্রতিষ্ঠা করা হয়। High Courts-কে দেওয়ানি, ফৌজদারি, মূল ও আপিলসহ বিভিন্ন এখতিয়ার দেওয়া হয়। এই সময়েই এমন বহু আইন প্রণীত হয়, যেগুলোর বড় অংশ এখনো বাংলাদেশের আইনে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— Penal Code, 1860 Evidence Act, 1872 Contract Act, 1872 Specific Relief Act, 1877 Transfer of Property Act, 1882 Code of Civil Procedure, 1908 Limitation Act, 1908 Code of Criminal Procedure, 1898 ফলে বাংলাদেশের আইনব্যবস্থায় English Common Law এবং Statutory Law-এর গভীর প্রভাব সৃষ্টি হয়। ৪. ১৯৪৭ সালের পর—পাকিস্তান আমল ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ড পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অংশ হয়। High Court of Judicature for East Bengal ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি পরবর্তীতে ঢাকা হাইকোর্ট নামে পরিচিত হয়। এর মূল, দেওয়ানি ও আপিল এখতিয়ার ছিল। ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধানের মাধ্যমে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে Supreme Court of Pakistan প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ঢাকা হাইকোর্ট তার অধীনস্থ হাইকোর্ট হিসেবে কাজ করে। ঢাকা হাইকোর্টের রিট জারির ক্ষমতা এবং অসাংবিধানিক আইন বাতিল করার ক্ষমতাও ছিল। তবে ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের পর সংবিধান বাতিল করা হয় এবং বিচারব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ৫. ১৯৭১—স্বাধীন বাংলাদেশের আইনব্যবস্থার সূচনা স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রে একেবারে শূন্য থেকে আইনব্যবস্থা শুরু করা হয়নি। Laws Continuance Enforcement Order, 1971-এর মাধ্যমে ২৫ মার্চ ১৯৭১ তারিখে বাংলাদেশে বলবৎ থাকা আইনগুলোকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাপেক্ষে বহাল রাখা হয়। পরবর্তীতে Bangladesh (Adaptation of Existing Laws) Order, 1972-এর মাধ্যমে বিদ্যমান আইনগুলোকে বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়। এ কারণেই আজও বাংলাদেশের আইনে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে প্রণীত বহু আইন কার্যকর রয়েছে। ৬. ১৯৭২ সালের সংবিধান—আইনব্যবস্থার নতুন ভিত্তি ৪ নভেম্বর ১৯৭২ বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ কার্যকর হয়। সংবিধানকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সংবিধানের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়— সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ Appellate Division High Court Division এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নিজস্ব সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থার ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ৭. বিচারিক নজিরের সাংবিধানিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের আইনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো Judicial Precedent। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১১ অনুযায়ী— Appellate Division কর্তৃক ঘোষিত আইন High Court Division-এর জন্য বাধ্যতামূলক; Supreme Court-এর যে কোনো বিভাগের ঘোষিত আইন অধস্তন আদালতগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক। এটি বাংলাদেশের Common Law ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ৮. আধুনিক বাংলাদেশের আইনব্যবস্থা বর্তমানে বাংলাদেশের আইনব্যবস্থা মূলত কয়েকটি উৎসের সমন্বয়ে গঠিত— সংবিধান + সংসদ প্রণীত আইন + অধীনস্থ বিধি/প্রবিধান + বিচারিক নজির + প্রচলিত রীতি ও ব্যবহার সংবিধানের ১৪৯ অনুচ্ছেদও বিদ্যমান আইনগুলোকে সংবিধানের অধীন রেখে বহাল রাখার নীতি গ্রহণ করেছে। পরীক্ষার জন্য সংক্ষিপ্ত ক্রম হিন্দু যুগ → মুসলিম যুগ → ব্রিটিশ যুগ → পাকিস্তান যুগ → মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৭১ → ১৯৭২ সালের সংবিধান → বর্তমান বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও Common Law ভিত্তিক আইনব্যবস্থা। মনে রাখার সহজ সূত্র: হিন্দু → মুসলিম → ব্রিটিশ → পাকিস্তান → বাংলাদেশ
← Back to All Articles
Click to Chat