বিধু ভূষন নাথ পলাশ
তোমরা সবাই চাঁদের জোছনা দেখেছো। দেখেছো কি চাঁদকে অস্ত যেতে? দেখেছো কি কখনো চাঁদের ভোর, রাত জেগে? সারারাত্র জ্যোস্না ঢেলে অবশেষে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে ঢলে পড়ে চাঁদ, গভীর ঘুমে। ধীরে ধীরে মাথা তোলে শান্ত রবি। ক্রমেই হয়ে ওঠে অশান্ত এবং এক সময় উত্তপ্ত এর পর ক্রমশঃ শক্তির মদমওতা কমতে শুরু করে। হয়ে যায় ডিমের কুসুমের মত নরম ও রঙ্গিন। চাঁদকে যদি ‘মা’ ধর। রবি হলো ‘বাবা’। এদেরই ঔরষে জন্মালাম আমি। নাম আমার সকাল। নরম ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে যায় দিন। পৃথিবীর তাবৎ গণিত ভূগোল-ব্যাকরন পড়ে থাকে একপাশে। সব স্কুল পালানো ছোড়ারা দল বেঁধে এখানে উড়াতে আসে ঘুড়ি। গাছে গাছে খুঁজে বেড়ায় পাখির বাসা। মাঠে চারে গো-মহিষ। তারই পাশে চলে দাঁড়িয়াবান্ধা আর গোল্লাছুট। খেলা শেষে এই ঝোপের পাশে বই খাতা রেখে ক্ষেতের ধারে জলাশয়ে দে-ঝাপ। চলতে থাকে সাঁতার। যতক্ষন পর্যন্ত না চোখ লাল হয়। যতক্ষন পর্যন্ত মায়েরা লাঠি নিয়ে পুকুর পাড়ে না আসে। আমি এসবে থোরাই করি কেয়ার। হিজল গাছের নীচে সুর তুলি ঠোঁটে-মনের সুখে। তাবৎ পাখীদের কন্ঠস্বর মিশে যায় বাঁশির তানে। পৃথিবীর সুখ প্রতিটি তন্ত্রীতে তন্নীতে শিহরন জাগায়। অনেককে দেখি আমি। লক্ষ্য করি গাঁয়ের কৃষক জেলে, কামার, কুমার, ছুঁতোর, মুদি, মাষ্টার মশাই, ছাত্র, যুবক, নারী-পুরুষ, ছাত্রদের মধ্যে ভাল ছাত্র, মাঝারি ছাত্র, পড়া ফাঁকি দেয়া ছাত্র, স্কুল পালানো ছাত্র, পড়া ছেড়ে দেয়া ছাত্ররা। তাদের সবার মনে কোন না কোন না পাওয়ার দুঃখ আছে। কিন্তু আমার মনে কোন দুঃখ নেই। নেই কোন আক্ষেপ। প্রকৃতির সন্তান আমি। পাখীর কণ্ঠস্বর আমাকে সুর শেখায়। নদীর কলকল ধ্বনি আমার হৃদয় ভাসায়। জলে ভাসা হাঁস, উড়ে যাওয়া বক, মাঠে চরা পশু এক অদ্ভুদ মায়া জাগায়। মনকে উদ্বেলিত করে। গোধুলীর রক্তরাগ দেখে আর জ্যোস্না রাতে আলোয় অবগাহন করে কাটাই পৃথিবীর চমৎকার দিনগুলি। গাছের মাচায় আমার ঘরে মাঝেমাঝে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আসে বেড়াল, কুকুর ছানা, ছাগল ছানা সহ কত রঙ্গবেরঙ্গের পাখি। এ গাছ থেকে ও গাছ কত গল্প লুকিয়ে আছে, জান কি। এ মাটি, এ বাগান, এ গাছ গাছালী, এ শস্যক্ষেত, এ নদী, এ মাঠ, এ জলাশয়, এ হাওর, এ বিল, এ মেঠো পথ আমার কতইনা আপন। কি যে মায়া লেগে আছে এসবে, ঠিক ভাষায় বোঝাতে পারবো না। আমি হেঁটে বেড়াই, খেলে বেড়াই, সাঁতার কাটি, মাছ ধরি, গল্প করি - মানুষ জীব জন্তু পশুপাখি। এভাবেই কেটে যায় দিন, আমার মা ‘চাদ’ আমার বাবা ‘সূর্য’। আমায় কখনো বকাঝকা করে না পড়ার জন্য, ক্লাসে ফাষ্ট হতে বলে না। চাপিয়ে দেয় না বইয়ের বোঝা, আমার নরম পিঠে। তবে এক মাষ্টার মশায় প্রায়ই আমার গাছের মাচার নীচে এসে জিরোয়। নিজে নিজে আক্ষেপ ছোড়ে আর বলে, “না, মানুষ হলো না ছেলেগুলো।” আমি মনে মনে ভাবি, নাহ। আমার মানুষ হবার ঝামেলা নেই। এত পড়া লেখা, এত বিদ্যে বুদ্ধি, তারপরও যেহেতু এরা মানুষ হচ্ছে না। তবে বয়েই গেছে আমার মানুষ হতে। আমি পাখির সুর হবো। অথবা নদীর কলধ্বনি কিংবা শিশুর খল খলানো হাসি। আমি মৃদু মন্দ প্রাণজুড়ালো হাওয়া হবে। হামিলনের বাঁশিওয়ালার মায়াবী সে তান হবো। সুরের জালে ভাসিয়ে নেবো সকল লোকের দুঃখরাশি। অথবা হতে পারি এমন একটি কবিতা যার কোন মানে নেই। কিংবা এমনি এক গল্প হবো যার কোন শুরুও নেই শেষও নেই।
কত বাউল এসে জিরোয় গাছের তলে। এক তারায় তোলে সুর। সুরের ঝংকারে মাতন জাগে প্রকৃতিতে। মিশে যায় নদী ও দূর পাহাড়ে। আমি উদাম হয়ে চেয়ে থাকি মুগ্ধ দৃষ্টিতে। চারদিক ঘিরে থাকা লোকজন - ছেলেপেলে যখন বিদেয় হয় তখন আমন্ত্রন জানাই বাউলকে আমার নতুন খাচায়। তাকে ফল দিই, জল দিই, আর দিই ফুলের মালা। সে আমায় গল্প শোনায় মানুষের। মানুষের সমাজের। বিদ্রোহের, বিপ্লবের। রোমের দাস বিদ্রোহ, সাঁওতাল থেকে গারো বিদ্রোহ, মোপ্লা থেকে সন্ন্যাস আর কোল বিদ্রোহ। সিপাহী বিদ্রোহ থেকে স্বদেশী আন্দোলন আর নানকার বিদ্রোহ। পৃথিবীর তাবৎ বিদ্রোহ আর বিপ্লবের গল্প। কে জানত ওর ভেতর এত আগুন আর আগ্নেয়গিরি লাভা, প্রতিনিয়ত বুদবুদ করছে। এ কে!! জামার বোতাম ছেঁড়া একটি ছেলে ঢিল মেরে সম্বিৎ ফেরায় আমার। আহবান করে ওর সাথে খেলতে যেতে। গতবারই স্কুল ছেড়েছে সে। বই - কাগজ - কলম কিনে দিতে পারে না ওর মা। পারে না বেতন দিতে। পয়সা নেই। তাই এ অবস্থা।
আমি কখনো পুঁথি পড়িনি। তবে কেন জানি প্রায়ই মনে হয় এ জগতের বাইরে আরো অনেক জগৎ আছে। অসংখ্য জগৎ। সুর্য্যি ডুবলে রাতের আকাশে ফোঁটা ফোঁটা বিন্দুর মত দেখা যায় সেগুলোকে। ঐ যে ছেলেটির কথা বলেছি, জামার বোতাম ছেঁড়া, কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি, তবুও ধরা যাক নাম তার বিকেল কিংবা গোধূলী। তোমাদের যা পছন্দ। পূর্ণিমা রাতে মাঝে মাঝে সেও যোগ দেয় আমার সাথে। দু’জনে মিলে তারা গুনি। এরপর রাত ভর গাছের মাচার উপর থেকে উপভোগ করি পূর্ণিমা। এক আশ্চর্য সৌন্দর্যে ডুবে যাই আমরা। ভোরে, অতি প্রতুষ্যে চাঁদকে আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে মিলিয়ে যেতে দেখি। পাখীরা যখন সমবায়ে উড়ে। কিচির মিচির শব্দে সচকিত করে তোলে, মাঠ, ক্ষেত, নদী বন জঙ্গল গং চারপাশের প্রকৃতিকে। মলিন চাঁদ তখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। রবির সাথে কোন এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে বিলিন হবার প্রস্তুতি নেয়। তার সাথে বিলীন হয় অসংখ্য বিন্দুর অচেনা জগৎগুলো। সেই ভোরে। চাঁদের ভোরে। তারই সাথে শুরু হয় উষ্ণ অভ্যর্থনা, আরেকটি নতুন দিনের। এক নতুন প্রভাতে।
← Back to All Articles