যে কাকেরা দ্রুত দৌড়াবে, তাদেরই পরবর্তী রাউন্ডে পাঠানো হবে। তবে হ্যাঁ উড়তে গেলেই ডিস কোয়ালিফাইড। সমানে নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে মাথায় লাল পট্টিওয়ালা কাকগুলো, যে কাগে রোনা, ফর্সা ও হাঁপানীতে ভোগে তাদের লাইন আলাদা। মঞ্চের পাশে হেলথ সেন্টার রয়েছে, দয়া করে মেডিকেল টেষ্টগুলো আগেই সেরে রাখুন। ঠ্যাং দিয়ে লাথ মেরে এক কাক তার পাশের কাকটিকে বলল, ধাক্কাস কেন। কাঁ। একটু সরে এসে অদ্ভুত স্বরে জবাব দিল “ওমাটিডিয়াম”। হাঁ করে তাকিয়ে রইল কাকটি। এ কোন দেশ থেকে এলোরে, ককেশাস নাকি ! কোষ্টারিকা। কি অদ্ভুদ ভাষায় বলছে। বাংলা মুলুকে এলি, তো বাংলা ভাষাটা শিখে এলিনা কেন?
সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ানো কাকেরা ভাবছে, একবার সুযোগ পেলে আজীবন সম্মাননা এবং খাদ্য পানীয়ের নিশ্চয়তা। বেশ উত্তেজনা বোধ কাজ করছে তাদের মধ্যে। স্বপ্নময় চোখে ভবিষ্যতের কত কিছু দেখে ফেলেছে তারা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রতিযোগী কাকেরা নিজেদের মধ্যে কত কি বলাবলি করছে। হরেক রকমের গুনগুন শব্দ ভেসে আসছে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। ‘শুন, কস্য’ ‘শুন, কাক্ষ’ ‘আরে শোন না কি বলি’ ‘না বিষয়টাকে যেভাবে দেখছি ........’ ‘স্রেফ মামদোবাজি’ হা হা হা (হাসির কলরব)। একজনের কথা খানিক পষ্ট কানে এল, বলছে, 'হ্যাঁ য়্যুনিভার্সিটি হষ্টেলের বাইরে মামার ক্যন্টিনে রুটি আর ডিম খাচ্ছিল কয়জন চশমাওয়ালা ছাত্র । আমরা জনা তিনেক সুযোগের অপেক্ষায়, কখন ছোঁ মারা যায় তক্কে তক্কে ছিলাম। ব্যাটারা রুটি ছুড়ে দিচ্ছিল আমাদের দিকে, অতীষ্ঠ হয়ে। আমাদের চোখ কিন্তু ডিমের দিকে এত দিকে, এত বড় প্রতিযোগিতায় আসব। আর পুষ্টিকর খাবার লাগবে না, তা কি হয়। ছুঁয়ে ও দেখিনি রুটির টুকরোর দিকে। কিছুক্ষন পর পর তেড়ে আসছিল ওদেরই একজন। কয়েকটা ছোঁ ব্যর্থ হবার পর দেখি টিফিন শেষ করে চা খাচ্ছে ওরা। অগত্যা গমের শুকনো রুটি মুখে নিয়েই পাড়ি দিতে হলো। তবে আসার আগে গোল চশমাওয়ালা ছেলেটার মাথায় টার্গেট প্রাকটিস করে মলত্যাগ করে আসতে ভুলিনি। এখানে এসে দেখি ওরে বাপস! এ যে, লাখ লাখ কাক। একেবারে কাক সমুদ্র। না কাকেদের তো শোক সভা ছাড়া কোন উৎসব মোচ্ছব হতে দেখিনি। ধর ইলেকট্রিক তারে নিজেরই ভুলে একজন শক খেয়ে ধপা¯ করে পড়ে মরে গেলেন তো, ব্যাস ! সেকেন্ডের মধ্যে সংবাদ ছড়িয়ে পড়তে দেরী শত শত কাক একত্র হতে দেরী নাই। আর আমাদের কাক মন্ডলীর শ্রদ্ধেয় মুরব্বী কাক দাদুর সভাপতির আসন অলংকৃত করতে দেরী নেই। আর সেই সভায় চলে মানুষের চৌদ্দ গোষ্ঠি উদ্ধার পর্ব। এনারা মানব সমাজকে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের জন্য যা যা গালাগাল দেন এগুলো শুনলে বুঝলে অর্থ্যাৎ শুনে বুঝলে আমাদের পাখি প্রেমী,পরিবেশ বাদী ও ইয়া বড় বড় ঢিল আর পাথর নিয়ে তেড়ে আসবেন। ভাগ্য ভাল। কাকগন যাই সাহিত্য কাব্য করে মানুষেরা কাকাকা ছাড়া আর কিছুই মনে করেন না। যাইহোক এদেখি বিশাল সভা। আবার ভলানটিয়ারা ঘোষনা দিচ্ছে কি সব অদ্ভুতুরে প্রতিযোগিতা। ভেবেছিলাম। নিশ্চই জল খাবারের ব্যবস্থা হবে। কিন্তু এত কাক মুখ ধোবে কই? হা হা হা হা (সংঙ্গে সংঙ্গে হাসির কলরব)/ শর্ত আছে উড়তে গেলেই ডিসকোয়ালি ফাইড। মনে রাখতে হবে। প্রতিযোগীতা হচ্ছে পায়ে হেঁটে দৌঁড়ানোর। ঠিক ষাড়, জেবরা, জিরাফ, উটপাখি আর মানুষে যেভাবে করে আর কি? মাইকে আবার ঘোষনা এল, স্বেচ্ছাসেবক কাকেদের আরো তৎপর হতে দেখা গেল। তাদের সবার গলায় লাল সুতার ব্যান্ড। গন্যমান্য কাক মন্ডলীর জন্য রয়েছে বিশেষ লাউঞ্চ। তাদের মাথায় চোঙ আকৃতির সবুজ রঙ্গের হ্যাট। গোমড়া মুখো কাক দল এক কোনে জটলা পাকানো, ওদের আড্ডায় কেবল সমালোচনা। হাসিখুশী কাকেরা পর¯পর ইর্য়াকি ফাজলামো আর খুনসুটি করছে। যুবতী কাকেরা যুবক কাকেদের উদ্দেশ্যে ঠাট্টা, মশকরা ছুড়ে দিচ্ছে। যুবক কাকেরা বেশ লাজুক প্রকৃতির হয়। মানুষদের ঠিক বিপরীত। তবে সকলের মধ্যে একটা সুন্দর সংস্কৃতি বোধ এবং শৃঙ্খলা বোধ ও আছে। সবাই সারিবদ্ধ ও বৃত্তাকার ভাবে বিন্যস্ত। বয়স্কদের যথেষ্ট সম্মান করে থাকে লাফালাফিতে সবাই। তাদের সামনে উচ্চ শব্দে হাসি, ঠাট্টা, ইয়ার্কি বা লাফালাফি করেনা। গোমড়া মুখে কাকেদের অঙ্গভঙ্গি বোঝা যায়। কিছু সমালোচনা হচ্ছে। এদের প্রত্যেকের চোখে মুখে ‘দেখে ফেলবে’ ‘বুঝে ফেলবে’ ‘ধরে ফেলবে’ এরকম ভাবসাব। একজন ফিস ফিসিয়ে বলল, প্রতি বছরই এমন হয় বেশ জম কালো ভাব । এরপর হয় কি, ছোঁড়ার দল এসে ঢিল ছুড়ে মাঠ শুন্য করে দেয়। কোথায় কর্মকর্তা, কোথায় ভলানটিয়ার কোথায় প্রতিযোগিতায়, কোথায় কি পুরস্কার। খিক খিক করে এমন ভাবে হাসল সবাই এক কোন থেকে, যেন দম আটকে যাবে আর কি। ফিস ফিসিয়ে এক কাক অন্য কেউই যেন না শুনতে পায় এমন ভঙ্গি নিয়ে খানিক ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, মানুষেরা। হ্যাঁ, মানুষেরা, শোন, কাকেদের মান্যি করে। খট খটিয়ে হেঁসে আরেকজন বিদ্রুপ করে বললে, কি বললে মান্যি করে, গন্যি করে, মানুষেরা? কাকেদের ? কৃত্রিম আশ্চর্যবোধক চিহ্ন ফুটে ওঠে তার চোখে মুখে। এ প্রেক্ষিতে পুরো আড্ডাসহ হাসির রোল পড়ে গেল। ‘প্রমান দিচ্ছি, প্রমান দিচ্ছি, বলে ঐ কাক চেচিয়ে বলল, শোনই না” কোন কিছু গোপন করার সময় মানুষ কি বলে, কি বলে? অন্য কাকেরা এ ওর দিকে চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। বিজ্ঞের মত ঐ কাকটি ভ্রু কুচকে বলল, 'দেখ কাক পক্ষীতে যেন টের না পায়। ‘মানে কি, মানুষ টের পেলে সমস্যা নেই। কিন্তু কাক টের পেলে রক্ষে থাকবে না। বুঝলে হে কতটা গুরুত্ব দেয় কাক জাতটাকে ‘হুম হুম!’ ভিড়ের মধ্যে একজন আরেকজনকে লাথ মেরে কথাটায় সায় দিতে লাগল। লাথি মারাটাই কাকের সম্মান প্রদর্শন। বন্ধুত্বের ও নিদর্শন। পায়ের ব্যবহার মানে বন্ধুত্ব আর ঠোঁটের ব্যবহার মানে শত্রুতা। বুদ্ধিদীপ্ত কালো চকচকে ঠোঁটওয়ালা কয়েকটি কাক এক পাশে বসে বোঝাই যায় কিছু গঠনমূলক আলোচনা করছে। একজন চশমাওয়ালা কাক (নারিকেল পাতার তৈরী ঠান্ডাকারী চশমা) বলল, খাবার আর মান সম্মান তো অধিকার। দেখ, এরজন্য ও প্রতিযোগিতা দিতে হয়। এতো এক ধরনের মূর্খতা ছাড়া কিছু নয়। মানুষেরা যে সিস্টেম করছে, কিছু ভাবতে হয় তাদের? যা করে সিস্টেমই করে দেয়। খাদ্যাহার, শিক্ষা, পানীয়, শিক্ষা স্বাস্থ্য, বিনোদন কোনটা বাদ নেই। বুঝলে হে, খেলাটা প্রতিযোগীতাটা ওদের বিনোদনের অংশ। আর আমরা জীবনের অংশ করে ফেলেছি। এক কাক একটু হেসে বলল যতই সিস্টেম করো, কথায় আছে, এক হাজার কাক সমান একটা ঢিল। গলায় সূতার মাপলার প্যাচানো উত্তেজিত এক কাঁক বলে উঠল, ময়লা, ঝুটা- নোংরা, আবর্জনা এসব খেয়ে রাস্তা-ঘাট, নালা-নর্দমা, আমরা পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখি। আমাদের এ অবদান মানুষ কি স্বীকার করে? উন্নত হলে করত। আমাদের খাদ্য পানীয়ের জন্য তখন আর প্রতিযোগীতা করতে হতোনা। হ্যাঁ ঠিক ! ঠিক ! বলতে বলতে মাঝ বয়সী এক কাক এগিয়ে এল একেবারে মধ্যখানে। আবারও বলল, “ঠিক কথা ! একটু জোরেই বলল। দম টেনে আবারো বলতে লাগল কূল আর লিচু গাছে ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখবে। বুঝলে, টিনের ঘন্টা।আর ধান ক্ষেতে কাক তাড়ুয়া। টিনের চালে আচার, আমস্বত্ব, ডালের বড়া, তিল, খাই দেবে। একটা জাল বিছিয়ে রাখবে মানুষগুলো। কি অবস্থা !! একি সহ্য হয় !! বলেই হাঁপাতে লাগল। ভেংচি কেটে আরে কাক বলল, না তা কি করে হয়, চুরি করার বিবিধ সমস্যা আর কি ! কথা টেনে নিয়ে আরেকজন বলল তুমি আর ফোঁড়ন কেটোনা। যথেষ্ট হয়েছে। এই হলো বুদ্ধিজীবি কাকেদের সমস্যা। কোনদিন তারা এক হতে পারলনা। এইসব তোমাদের শহরের কাকেদের সমস্যা যারা পর নির্ভরশীল। আমরা অরন্যের কাক। প্রকৃতি থেকেই আহরণ করি। মানুষের দয়ার উপর ভিত্তি করে চলি না। গৃহ নির্মাণ শিল্পিবাবুই পাখির মত বাসা বানাতে আমরা ও কম যাই না। কোকিল পাখির ডিম সযত্নেকশ্যলালন করি আমরা” “এবং তা অনেকটা বোকার মত না বুঝে, বাধ্য হয়ে।” বশ্য নামের এক কাকের বিদ্রুপে হেঁসে উঠল সবাই। একটা কলা পাতা গোল করে তারভেতর জল দিয়ে বানানো বিশেষ দূরবীন দিয়ে এক সাংবাদিক কাক গাছের মগ ডাল থেকে প্রথম থেকেই বিভিন্ন সংবাদ দিচ্ছে। এইবার নিজে নিজে বলছে, সর্বনাশ ছেলের দল গুলাল আর পাথর হাতে আসছে এদিকে। বেটারা টের পেয়েছে, কিভাবে কারা এবার ঠেলা সামলাও! চক চকে ঠোঁট ওলা কাক আরেকজনকে জিজ্ঞেস করছে, আসছে। পালাতে উদ্যত এক রসিক কাক যাচ্ছে আর পিছন ফিরে বলছে, সম্রাট টিপুসবাইকেইসুলতানের বাহিনী আসছে !! গোলাবারুদ নিয়ে, জলদি পালাও !!! নইলে সবাইকেই সিষ্টেমের মধ্যে ফেলে দেবে!! তাৎক্ষনিক মাইকে ঘোষণা এল “ভদ্র কাকমন্ডলী কোন ব্যাপার না” প্লান বি অনুযায়ী আমাদের সভার ভেন্যু পরিবর্তন করে নদীর ওপরে টিলায় নেয়া হয়েছে। সেখানে আমাদের আরও একটি টিম প্রস্তুত। আয়োজন চলবে। ঘোষণা শুনে সকলের জানে পানি এল। যেই কথা সেই কাজ। বিকেলের আকাশে মেঘেদের সাথে নদীর ওপর দিয়ে টিলার দিনে ভেসে যেতে থাকা কাকদের বহন বেশ চমৎকার দেখছিল তখন। ফিরোনজি রাশিমালায় উড়তে থাকা কাকদের দেখে অভিভূত হতে হয় যে কাউকে যদিও তা দেখে একটু আগের ঘটনা অনুমান করার কোন সাধ্যই কারো নেই।
← Back to All Articles