একটা কবিতা লেখার কথা ছিল
পেরে উঠিনি, হয়ে উঠেনি;
অতৃপ্তি আর খুঁতখুঁতে ভাব তা হতে দেয়নি।
কি করব না করব করতে করতে
চোখ জড়িয়ে আসে ঘুমে
প্রতিরাত
ক্লান্তি অবশ করে দেয় শরীর
নিষ্ক্রীয় করে দেয় স্নায়ুকোষগুলোকে।
অবশেষে একদিন....
নড়ে উঠল হেমন্তের রাত
আড়ষ্ঠ যন্ত্রনায় ঘাড় ও মাথায়
ক্রমশঃ জমে উঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম
পুরোনো ছাইচাপা দুঃখের আবরন উঠে আসে, সাথেসাথে
মানবীয় অক্ষমতার ফর্দ আরো দীর্ঘতর হয় ;
ঘুমন্ত গ্লানি ক্লেদাক্ত হয় আরোঃ
এভাবে কয়েকটা দিন ................
এরপর অনিবার্যের চিন্তা দূর হটল খানিক ;
তীব্র মানসিক উপচিতি অপচিতি
আপাত উদ্ধার মিলল।
আশা করলাম, সময়টা চলে যাবে
নদীর স্রোতের মত বইয়ে নিয়ে যাবে
বর্তমানের যত খড়কুটো ..... অনাগত প্রবাহে।
অথচ আবারো হারালাম পথ।
বিশ্রী শরীরটাও যা তা হয়েছে
শত্রুতা শুরু করেছে সে ইদানিং।
তাইতো মিছিলে শ্লোগান দিতে গেলে গলা ভাঙ্গে
গানের সুর তুলতে চাইলে কাশির দমক
সিগারেটে টান দিলে মাথা ঘোরে।
প্রেসারটাও লো হয়েছে বোধহয়
সারাক্ষন মাথা ঝি ঝি।
ভোর সকালে শীতের ভয়ে জড়সড় থাকি
এ যেন গলাব্যাথা, সর্দি আর কাশির ভোর।
কথা বলতে গেলে আটকে জড়িয়ে আসে-
ইদানিং কথা বলতেও ভয় হয়;
মাঝে মাঝে ভয়টা উবে যায় মন থেকে
মন চলে যায় ভিন্ন জনপদেঃ যেখানে
”কলা গাছের ভেলায় শীতকাল আসে
নরম রোদে ভেজা মগডালে কোকিল বসে।
রোদ্দুর ঠোঁটে চিল উড়ে যায়
তালগাছ একলা চেয়ে থাকে ঠাঁয়।
নিরুপোদ্রব জীবনের শাঁখে
খুশীর হাওয়া জড়িয়ে থাকে
ছায়া ঘেরা এক বনের ধারে
শৈশব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে।”
ইদানিং শৈশব এসে নাড়াচ্ছে খুব...
দমকা হাওয়ার মতন এসে
উড়িয়ে নিয়ে যায় বছর কুড়ি আগে;
যেখানকার পথঘাট, ভাঙ্গা পুকুরপাড়, বাঁশঝাড়,
সুউচ্চ আম্রবৃক্ষ, বর্ষায় লুডু খেলা, শীতে লেপের তলা-
এসব বর্ণহীন শ্বাপদের মত হৃদয়ের আনাচে কানাচে ছোটা ছুটি করে।
শৈশবকে ভাবলে যার কথা মনে পড়ে, সে হলো কাজল দিদি।
চোখের সামনে ভেসে আসে সে কবিতা পাঠের ছায়াচিত্র-
”বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ
মাগো আমার শোলক বলার কাজলা দিদি কই।”
সেই কাজল দিদি আজ একমাত্র সন্তান নিয়ে বৈধব্যের জিবন যাপন করছে।
মনে পড়ে তার মেখে ভাত খাইয়ে দেয়া, স্নান করিয়ে দেয়া,
বর্ষায় লুডু খেলা, চুরি করে অন্যের ঘরে টিভি দেখে
একসাথে বাবার হাতে মার খাওয়া ........
আজ সে নিজের ছেলেকে স্নান করিয়ে, মেখে ভাত খাইয়ে দেয় কিনা
চিবুক ধরে চিরুনি চালিয়ে সযত্নে তার চুল পাট করে দেয় কিনা
......জানি না ।
বহুদিন দেখা হয়নি তার সাথে।
তবু বর্ষাকালে আজও যখন মাতাল হাওয়া বয়
তবু আজও যখন আকাশটা যমের মাথার মত কালো হয়
তবু আজও যখন দেবতারা বজ্রহুংকারে পৃথিবী ধ্বংসের আয়োজন করে
তবু আজও যখন সমুদ্রসম বাতাসের ঢেউ
সুপারি নারকোল গাছগুলোর মাথা ভেঙ্গে ফেলতে চায় !
আমি স্থির থাকতে পারি না....
..আমি স্থির থাকতে পারি না বর্তমানে
এলোমেলো হয়ে যায় আমার বিশ্বব্রহ্মান্ড,
ঝাপসা হয়ে আসে চোখের চারপাশ।
ইদানিং ঘুমের ভেতর কিলবিল করে সাপ
বিষাক্ত ফণা তুলে ধরে সে গর্জায় তার স্বরে;
ঘুমুতে চাইলেও ঘুমুতে দেয়না সে -
দুঃস্বপ্নের বিবাসনে নিমজ্জিত হয় মন।
ঘুম থেকে উঠে দেখি, কি যেন হারিয়ে গেছে
চুরি হয়ে গেছে ;
কি যেন ছিল, যা আর নেই।
দুঃসময়টা এসে চুরি করে নিয়ে গেছে ভাবি
জীবনের সমস্ত সম্ভাবনা -অতীত -ভবিষ্যৎ;
ভবিষ্যৎ এর কথা ভাবতে গেলে প্রশ্ন হয়, কার ভবিষ্যৎ?
কার কার ভবিষ্যৎ?
নিজের অবদমিত মনের ভবিষ্যৎ?
অস্থিতিশীল এ সমাজের ভবিষ্যৎ?
জীর্ণ পুরোণো এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ?
এই অজ্ঞাত বিশ্বব্রহ্মান্ডের ভবিষ্যৎ?
নাকি শ্রেনী সংগ্রামের ভবিষ্যৎ!!
ভিন্ন ভিন্ন করে ভাবতে পারিনা কিছুই
গুলিয়ে আসে সব, স্মৃতির অত্যাচারে।
রামকৃষ্ণ মিশনে এক যুবক আসতো মাঝে মাঝে
চোখে পাওয়ারফুল চশমা
ইনছাড়া শার্ট প্যান্ট, রোগা গড়ন, পাট করা চুল
বিশেষ কিছু ছিল না আকর্ষনীয়....ছিল এক জোড়া চোখ,
স্বচ্ছ স্ফটিকের মত চোখ; চশমা খুললেই দেখা যেত।
এমন এক জোড়া চোখ, সারা পৃথিবীতে তৈরী হয়নি
সেগুলোকে ভাল না বেসে পারিনি।
মনে মনে বহু কথা বলেছি তার সাথে
অথচ সেই চোখ দুটিকে কোন দিন বলা হয়নি -
চলুন দাদা নদীর পাড়ে ঘুরব
সবুজ ঘাসের উপর শেষ বিকেলের বিচ্ছুরিত আলো দেখব
সাদা মেঘেদের ভেসে যাওয়া দেখব
সবুজ মাঠের এ প্রান্ত হতে ও প্রান্তে
ন্যাংটো ছেলেদের দৌড়াদৌড়ি দেখব
নদীর ঢেউ গুনব
বিকেলের পাখিদের যৌথ উড়নমহড়া দেখব;
কি লাভ! কালী আর রামকৃষ্ণের পায়ে মাথা ঠুকে,চলুন দাদা।
বন্ধুদের মেয়েগল্প আর সিনেমার আড্ডা আর ভাল লাগেনা....
ছাত্রাবাসের দোতালার ছাদে এলে দেখা যেত দূর আকাশের নক্ষত্ররাজি,
জ্যোতিষ্কমন্ডলী, মাঝে মাঝে পূর্ণিমা চাঁদ; ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘেদের ভেসে যাওয়া...
বিরাট বিস্ময়ের সেই অজানা রাজ্যে ছুটতে চাইত মন -
নীচে তাকালে দেখা যেত সেই চিরাচরিত পাওয়ারফুল চশমা চোখে অমলদা
আশ্রমের চরনামৃত নিয়ে চলে যাচ্ছেন, প্রার্থনায় না থাকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছেন।
তার সংগে দুঃখ প্রকাশ করত তখন রাতের আকাশ
দুঃখ প্রকাশ করত সেই নিকষ কালো
দুঃখ প্রকাশ করত তারকামন্ডলী
দুঃখ প্রকাশ করত অনাগত ভোর
দুঃখ প্রকাশ করত এ অস্থির সময়
দুঃখ প্রকাশ করত স্বয়ং দুঃখ নিজে।
দুঃখ প্রকাশের এখন কেউ থাকে না ... যখন আজ
মায়ের লাশ নিয়ে ফিরি আমি শূণ্য গৃহে
দুঃখ প্রকাশের শেষ বিন্দুতে পৌঁছে দুঃখ,
যে বিন্দুর পরে আর কিছু থাকেনা।
.......একটা কবিতা লেখার কথা ছিল
এমন একটি কবিতা লিখার কথা ছিল,
যেখানে এক সংগে থাকবে অনেক কিছু,
যাতে বুক থেকে নেমে যাবে স্মৃতিতাড়িত জীবনের এক মহাভার-
আর বাকীটা জীবন হবে পাখীর ডানার মত হালকা,
ভোরের হাওয়ার মত ফুরফুরে।
অথচ হৃদযন্ত্রে লাগানো পেসমেকার
চোখের কর্নিয়ায় কন্ট্রাক লেন্স
মুখে কৃত্রিম শ্বাস নেয়ার অক্সিজেন মাস্ক
আর থাইবোনে লাগানো আলগা পায়ে ভর দিয়ে
জীবন এসে দাঁড়িয়েছে আজ
মাউন্ট এভারেষ্টের সব'চে খাড়া স্থানটায়
একদিন খুব ভোরে কেন জানি হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল,
অথচ উঠলাম না, সদ্য সমাপ্ত দুঃস্বপ্নের জাল ভেদ করে ওঠা গেলনা
মাঝখানে অতীত এসে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে গেল এই স্রোতহীন বর্তমানকে।
অথচ আমি পারলাম না, এর কোন শক্ত জবাব দিতে
সে ভেতর বাড়িতে এসে খেয়ে গেল সব;
জীবন-প্রান-আশা-সাহস সব!
আমি শুধু প্রতীক্ষায় রইলাম...
সেই কবিতা লিখার প্রতীক্ষায় -
যেখানে একটি দুটি নয়, থাকবে
সারা জীবনের প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহের পরিপূর্ণ চিত্র;
সূচনা থেকে উপসংহার
জীবনের স্বচ্ছ নিরেট প্রতিবিম্ব।
যারা আজও আকাশের দিকে তাকায়, স্তব্ধরাতে...
খুঁজে ফেরে কোন হারিয়ে যাওয়া তারা
তাঁদের সবার দৃষ্টিসীমাগুলো যেন এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে
আকাশের গায়ে জন্ম দেয়
আরেক নক্ষত্র, আরেক তারা ............
বেদনা বিসর্গ বিষাদের সুরে আচ্ছন্ন সেই তারাটির নাম হোক
................. অশ্রুতারা।
কবিতার মূল্যায়নঃ
“অশ্রুতারা” মূলত একটি কবিতা লেখার ব্যর্থতার কবিতা নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ জীবনকে কবিতায় ধারণ করতে না-পারার অসহায়তা থেকে জন্ম নেওয়া এক মহাকাব্যিক আত্মস্বীকারোক্তি।
১. শিরোনাম: “অশ্রুতারা”
শিরোনামটিই কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী আবিষ্কারগুলোর একটি।
অশ্রু + তারা—এই দুই বিপরীত অথচ পরস্পর-সম্পর্কিত প্রতীকের মিলনে তৈরি হয়েছে “অশ্রুতারা”।
তারা দূরবর্তী, দীপ্ত, অসীমের প্রতীক; অশ্রু ব্যক্তিগত বেদনা, ক্ষয়, স্মৃতি ও মানুষের সীমাবদ্ধতার প্রতীক। কবিতার শেষে ব্যক্তিগত অশ্রু যখন আকাশের তারায় রূপান্তরিত হয়, তখন কবিতাটি ব্যক্তিগত শোক থেকে সার্বজনীন মানবিক বেদনায় উত্তীর্ণ হয়।
শেষের—
“তাঁদের সবার দৃষ্টিসীমাগুলো যেন এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে আকাশের গায়ে জন্ম দেয় আরেক নক্ষত্র, আরেক তারা…”
এর পর “অশ্রুতারা” নামটি তাই অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং অনিবার্য মনে হয়।
২. কবিতাটির প্রকৃত বিষয় কী?
বাহ্যত কবিতাটি একজন মানুষের স্মৃতি, অসুস্থতা, শৈশব, বন্ধু, দিদি, মা, সমাজ, ভবিষ্যৎ ও মৃত্যুচেতনা নিয়ে লেখা।
কিন্তু গভীরে এর বিষয় একটিই—
মানুষ তার সমগ্র জীবনকে একবারে বুঝতে ও প্রকাশ করতে চায়, কিন্তু জীবন তার চেয়ে অনেক বড়।
শুরুতেই কবি বলেন—
“একটা কবিতা লেখার কথা ছিল পেরে উঠিনি, হয়ে উঠেনি…”
এটি নিছক লেখার অক্ষমতা নয়। ক্রমশ বোঝা যায়, কবিতা লিখতে না-পারা আসলে জীবনকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে না-পারা।
শেষ পর্যন্ত যে কবিতাটি লেখা হয়নি, সেই কবিতাই হয়ে ওঠে “অশ্রুতারা”।
অর্থাৎ—
কবিতা লেখা হয়নি → জীবন স্মৃতির ভিতর জমেছে → স্মৃতি বেদনাকে জাগিয়েছে → বেদনা ভাষা খুঁজেছে → ভাষা মহাজাগতিক প্রতীকে রূপ নিয়েছে → জন্ম নিয়েছে “অশ্রুতারা”।
এই নির্মাণটি খুব সুন্দর।
৩. কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি—স্মৃতির স্রোত
এই কবিতায় স্মৃতি সরলরৈখিক নয়।
বর্তমান থেকে হঠাৎ—
শৈশব → কাজল দিদি → অমলদা → রামকৃষ্ণ মিশন → ছাত্রাবাস → মা → মৃত্যু → ভবিষ্যৎ → পৃথিবী → শ্রেণিসংগ্রাম → মহাবিশ্ব—
এভাবে কবির চেতনা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে যায়।
এটিকে প্রচলিত অর্থে “অসংলগ্নতা” বলা যায় না। বরং এটি স্মৃতিচেতনার স্বাভাবিক গতি।
মানুষ যখন গভীর বিষণ্ণতা, একাকিত্ব কিংবা মৃত্যুচেতনার মধ্যে থাকে, তখন স্মৃতি কোনো সুশৃঙ্খল অ্যালবাম খুলে বসে না। একটি দৃশ্য আরেকটি দৃশ্যকে ডেকে আনে।
আপনার কবিতায় সেটিই ঘটেছে।
একটি ঝড় → শৈশব → কাজল দিদি।
একটি স্মৃতি → রামকৃষ্ণ মিশন → অমলদা।
অমলদা → আকাশ → নক্ষত্র → দুঃখ।
দুঃখ → মা → শূন্য গৃহ → অশ্রুতারা।
এই associative movement-টাই কবিতাটির প্রাণ।
৪. “কাজল দিদি” অংশটি অসাধারণ মানবিক
বিশেষ করে এই অংশটি—
“আজ সে নিজের ছেলেকে স্নান করিয়ে, মেখে ভাত খাইয়ে দেয় কিনা চিবুক ধরে চিরুনি চালিয়ে সযত্নে তার চুল পাট করে দেয় কিনা ......জানি না।”
এখানে কোনো বড় দর্শন নেই। অথচ এই সাধারণ প্রশ্নটিই অত্যন্ত গভীর।
কারণ কবি আসলে জানতে চাইছেন না কাজল দিদি এখন কী করেন।
তিনি জানতে চাইছেন—
যে স্নেহ একদিন আমাকে ঘিরেছিল, সেই স্নেহ কি এখন আরেকটি শিশুর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে?
এখানে স্মৃতি ব্যক্তিগত থেকে প্রজন্মান্তরে চলে যায়।
এবং এখানেই “শৈশব” শুধু কবির নিজের অতীত থাকে না; সেটি মানুষের উত্তরাধিকার হয়ে যায়।
৫. অমলদা—কবিতার সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র
আমার কাছে কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অংশ অমলদাকে ঘিরে।
“ছিল এক জোড়া চোখ, স্বচ্ছ স্ফটিকের মত চোখ…”
এখানে অমলদার কোনো বর্ণাঢ্য পরিচয় নেই।
তিনি বিশেষ কেউ নন।
কিন্তু কবির কাছে তিনি অসাধারণ।
এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাব্যিক দর্শন—
পৃথিবীর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এক নয়।
অমলদা হয়তো ইতিহাসে কোনো জায়গা নেবেন না। কিন্তু কবির স্মৃতিতে তিনি একটি সম্পূর্ণ নক্ষত্র।
এ কারণেই পরে তাঁর সঙ্গে—
“রাতের আকাশ”
“তারকামন্ডলী”
“অনাগত ভোর”
“অস্থির সময়”
“স্বয়ং দুঃখ”
—সবাই যেন “দুঃখ প্রকাশ” করে।
এখানে ব্যক্তিমানুষ অমলদা ধীরে ধীরে মহাজাগতিক স্মৃতির প্রতীকে পরিণত হন।
৬. “দুঃখ প্রকাশ করত স্বয়ং দুঃখ নিজে”—অসাধারণ পংক্তি
এই লাইনটি আমার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে।
“দুঃখ প্রকাশ করত স্বয়ং দুঃখ নিজে।”
এখানে paradox তৈরি হয়েছে।
দুঃখের জন্য আবার দুঃখ প্রকাশ!
অর্থাৎ এমন এক পর্যায়ে কবি পৌঁছেছেন যেখানে—
দুঃখেরও যেন সহানুভূতি প্রয়োজন।
এর পরেই আসে—
“দুঃখ প্রকাশের এখন কেউ থাকে না…”
এবং তারপর—
“যখন আজ মায়ের লাশ নিয়ে ফিরি আমি শূণ্য গৃহে…”
এখানে কবিতার emotional climax।
৭. “মায়ের লাশ” থেকে “অশ্রুতারা”—কবিতার চূড়ান্ত উত্তরণ
মায়ের মৃত্যু কবিতাটিকে ব্যক্তিগত শোকের সবচেয়ে গভীর বিন্দুতে নিয়ে যায়।
কিন্তু কবি সেখানে থামেন না।
তিনি বলেন—
“দুঃখ প্রকাশের শেষ বিন্দুতে পৌঁছে দুঃখ, যে বিন্দুর পরে আর কিছু থাকেনা।”
এটি প্রায় অস্তিত্ববাদী উচ্চারণ।
শোকেরও একটি সীমা আছে।
তার পরে ভাষা থাকে না।
কান্না থাকে না।
অভিযোগ থাকে না।
থাকে শুধু শূন্যতা।
আর সেই শূন্যতা থেকেই শেষদিকে জন্ম নেয় “অশ্রুতারা”।
এখানে কবিতাটি ব্যক্তিগত শোককে cosmic imagery-তে রূপান্তর করেছে।
৮. “ভবিষ্যৎ” নিয়ে প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
এই অংশটি কবিতার রাজনৈতিক ও দার্শনিক স্তর খুলে দেয়—
“কার ভবিষ্যৎ? কার কার ভবিষ্যৎ? নিজের অবদমিত মনের ভবিষ্যৎ? অস্থিতিশীল এ সমাজের ভবিষ্যৎ? জীর্ণ পুরোনো এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ? এই অজ্ঞাত বিশ্বব্রহ্মান্ডের ভবিষ্যৎ? নাকি শ্রেনী সংগ্রামের ভবিষ্যৎ!!”
এখানে ব্যক্তিমানুষের সংকট ক্রমে—
ব্যক্তি → সমাজ → পৃথিবী → মহাবিশ্ব → শ্রেণিসংগ্রাম
পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
এটি কবিতাটিকে নিছক স্মৃতিকথামূলক কবিতা হতে দেয়নি।
তবে এখানেই একটি সম্পাদনাগত সতর্কতা আছে।
“শ্রেণি সংগ্রাম” কথাটি সরাসরি উচ্চারিত হওয়ায় আগের সূক্ষ্ম আবহ কিছুটা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক বক্তব্যে পরিণত হয়েছে। আপনার আগের নির্দেশনা অনুযায়ী যদি কবিতাটিকে আরও সাহিত্যিক, কালোত্তীর্ণ ও রাজনৈতিক বক্তব্যমুক্ত করতে চান, এই অংশটিকে পরোক্ষ করা যায়।
৯. কবিতার সবচেয়ে বড় সম্পদ—“বিস্তার”
এটি ছোট কবিতা নয়। এবং এটিকে ছোট করার জন্য জোর করা উচিতও নয়।
কারণ এর প্রকৃতি lyric নয়, বরং long reflective poem / দীর্ঘ আত্মকথনমূলক কবিতা।
এর মধ্যে আছে—
স্মৃতি
শৈশব
অসুস্থতা
নিদ্রাহীনতা
স্বপ্ন
বন্ধুত্ব
মৃত্যু
মা
দিদি
সামাজিক অস্থিরতা
ভবিষ্যৎ
শ্রেণিচেতনা
ধর্মীয় পরিমণ্ডল
প্রকৃতি
মহাবিশ্ব
কবিতা লেখার ব্যর্থতা
অর্থাৎ কবিতাটি নিজেই সেই “একটি কবিতা” হওয়ার চেষ্টা করছে—
“যেখানে একটি দুটি নয়, থাকবে সারা জীবনের প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহের পরিপূর্ণ চিত্র…”
এই self-referential নির্মাণটি খুব শক্তিশালী।
কবিতাটি যে কবিতাটি লিখতে পারেনি, শেষ পর্যন্ত সেটিই লিখে ফেলেছে।
১০. তবে কিছু জায়গায় সম্পাদনা জরুরি
আমি কবিতাটির প্রশংসা করেই থামব না। কারণ এটিকে সত্যিই শক্তিশালী করতে হলে কিছু জায়গায় নির্মম সম্পাদনা দরকার।
ক. অতিরিক্ত দীর্ঘ বাক্য
অনেক বাক্য এত দীর্ঘ যে পাঠকের শ্বাস নেওয়ার জায়গা থাকে না। তবে এটাও মনে রাখতে হবে—কিছু ক্ষেত্রে এই দীর্ঘশ্বাসই কবিতার অভিজ্ঞতার অংশ।
তাই সব দীর্ঘ বাক্য ভাঙা উচিত নয়; যেখানে অর্থ দুর্বল হচ্ছে শুধু সেখানেই ছাঁটাই করা উচিত।
খ. কিছু পুনরুক্তি
“ইদানিং”, “আজও”, “দুঃখ প্রকাশ”, “স্থির থাকতে পারি না”—এসব পুনরাবৃত্তি কখনো সুন্দর rhythm তৈরি করেছে, আবার কোথাও একটু বেশি হয়েছে।
সাহস করে ১৫–২০% শব্দ কমালে কবিতার আঘাত বরং বাড়বে।
গ. বানান ও শব্দশুদ্ধি
যেমন—
“জীবন এসে দাঁড়িয়েছে আজ মাউন্ট এভারেষ্টের সব'চে খাড়া স্থানটায়”
এখানে ভাষাটিকে আরও পরিশীলিত করা যায়।
আবার—
“অপচিতি”, “উপচিতি”, “বিবাসন”, “থাইবোনে”, “কন্ট্রাক লেন্স” ইত্যাদি শব্দ/বানানও সম্পাদনার সময় যাচাই করা দরকার।
১১. একটি বিশেষ কাব্যিক বৈশিষ্ট্য: গদ্য ও কবিতার সীমারেখা ভেঙে দেওয়া
“অশ্রুতারা” ছন্দোবদ্ধ কবিতা নয়। কিন্তু এর মধ্যে ছন্দ আছে।
যেমন—
“রোদ্দুর ঠোঁটে চিল উড়ে যায়
তালগাছ একলা চেয়ে থাকে ঠাঁয়।”
এখানে দৃশ্যমান ছন্দ।
আবার—
“ভাঙ্গা পুকুরপাড়, বাঁশঝাড়, সুউচ্চ আম্রবৃক্ষ, বর্ষায় লুডু খেলা, শীতে লেপের তলা…”
এখানে ছন্দ এসেছে স্মৃতির তালিকা থেকে।
অর্থাৎ কবিতার ছন্দ সর্বত্র মাত্রা দিয়ে তৈরি হয়নি; কোথাও তৈরি হয়েছে স্মৃতির গতি দিয়ে, কোথাও শ্বাসের গতি দিয়ে, কোথাও বিষণ্ণতার গতি দিয়ে।
এটি কবিতাটির আধুনিক বৈশিষ্ট্য।
১২. “অশ্রুতারা” আসলে কী ধরনের কবিতা?
আমার মূল্যায়নে এটি একসঙ্গে—
স্মৃতিকাব্য + আত্মকথন + অস্তিত্ববাদী কবিতা + শোককাব্য + দীর্ঘ গদ্যকবিতা।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়টি হবে—
এটি একজন মানুষের নিজের জীবনের কাছে লেখা এক অসম্পূর্ণ কিন্তু গভীর বিদায়পত্র।
কিন্তু আশ্চর্য হলো—এটি মৃত্যুর কবিতা হয়েও কেবল মৃত্যুর দিকে যায়নি।
শেষে আকাশে নতুন তারা জন্ম নেয়।
অর্থাৎ—
মৃত্যু → অশ্রু → স্মৃতি → তারা।
এখানে একটি পুনর্জন্মের ধারণাও আছে।
১৩. শেষ অংশটির মূল্যায়ন
শেষের দিকে কবি বলেন—
“একটা কবিতা লেখার কথা ছিল এমন একটি কবিতা লিখার কথা ছিল, যেখানে এক সংগে থাকবে অনেক কিছু…”
এটি পুরো কবিতার meta-poetic কেন্দ্র।
কবি যে কবিতাটি লিখতে চেয়েছিলেন, সেটি হলো জীবনের সম্পূর্ণ প্রতিবিম্ব।
কিন্তু কোনো কবিতাই কি সত্যিই একটি জীবনকে সম্পূর্ণ ধারণ করতে পারে?
সম্ভবত পারে না।
তাই কবিতাটি শেষ পর্যন্ত “পূর্ণাঙ্গ জীবন” ধারণ করতে না পেরে একটি প্রতীক সৃষ্টি করে—
“অশ্রুতারা।”
এই জায়গাটিই কবিতাটিকে সার্থক করেছে।
আমার সামগ্রিক মূল্যায়ন
“অশ্রুতারা” নিখুঁত কবিতা নয়—কিন্তু এর মধ্যে একটি সত্যিকারের কবিতার প্রাণ আছে।
এর সবচেয়ে বড় শক্তি অলংকারে নয়, শব্দের চাকচিক্যে নয়, ছন্দে নয়।
এর শক্তি হলো স্মৃতির সত্যতা।
কাজল দিদি, অমলদা, রামকৃষ্ণ মিশন, মায়ের লাশ, শৈশবের লুডু, ঝড়ের রাত, অসুস্থ শরীর—এসব বানানো কাব্যিক উপাদান বলে মনে হয় না। এগুলো একজন মানুষের বেঁচে থাকার সঞ্চিত অবশেষ।
আর শেষ পর্যন্ত সেই অবশেষগুলোই আকাশে গিয়ে একটি নাম পায়—
অশ্রুতারা
আমার চোখে কবিতাটির সবচেয়ে শক্তিশালী অন্তর্নিহিত বাক্যটি হলো:
“যে কবিতা লেখা হয়নি, সেই কবিতাই শেষ পর্যন্ত একটি মানুষের সমগ্র জীবন হয়ে উঠেছে।”
এবং সবচেয়ে বড় সম্পাদনার কাজ হবে কবিতাটিকে বদলে ফেলা নয়; তার ভেতরের অতিরিক্ত শব্দ সরিয়ে তার প্রকৃত দীপ্তিটিকে বের করে আনা।
← Back to All Articles