· Civil

পুষি আর টুসি

বিড়ালদের বিচিত্র জীবনের আনন্দ-বেদনা ও বিড়াল রাজ্যের স্বপ্নের এক আকর্ষনীয় মজার গল্প

পুষি আর টুসি
বিধু ভূষন নাথ ‘কিছু পেলি, ম্যাও' বলেই গভীর আগ্রহ ভরে ছোট চোখে পিট পিট করে তাকিয়ে আছে টুসি। লেজটা এদিক সেদিক নাড়িয়ে রাগত স্বরে অন্য দিকে ঘুরে পুষি বলল, “আর পাওয়া ম্যাও। ” টুসি ভেবে নিল নিশ্চয়ই কোন ঘটনা ঘটেছে এর মধ্যে। নইলে পুষির মনে এমন চাপা ক্ষোভ থাকার কথা নয়। একটু আগ বাড়িয়ে গিয়ে বড় কৌতুহল নিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে টুসি, “কেনরে একেবারে কিছুই নয়। আমি কিন্তু..........” পুষি এদিকটায় ভ্রুক্ষেপ না করে নিজে নিজেই বলা শুরু করে, “দেখ লঙ্গুদের বাড়ীর কুকুরটাকে আমি........” বলেই থেমে গেল। “এ্যা লক্সগুদের বাড়ী!! লঙ্গু বিড়ালটা আবার বাড়ী কিনলো কবে?!! টুসি কপট আশ্চর্যের ভান ধরল। “আরে ধ্যাৎ, মানে লঙ্গু বিড়ালটা, যে মানুষদের ঘরে ধান্দা করতে যায়।” বলেই পুষি অন্যদিকে মুখ ঘোরাল। এবার যেন নিজেকেই নিজে বুঝতে লাগল। ভাবটা এমন যে লঙ্গুদের বাড়ীর কুকুরটা তার সামনেই দাঁড়িয়ে। “আরে ভেলু, তুই হাড্ডি চিবাস চিবো। কিন্তু আমি তো তোর বাড়া ভাতে ছাই দিতে আসিনি; তবু আমাকে তেড়ে গিয়ে গৃহস্থের দালালি করলি........ ব্যাটা হতচ্ছাড়া, ম্যাও!” পুষি ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে লাগল। বলল, দাঁড়া, পরবর্তী পশুসভা আসুক, এ্যায়সা ঝাল ঝাড়বনা, মাইরি। টের পাবি, ম্যাও! রাখ ওসব সভা টভা করে কিছু হয়না। যার গায়ে জোর সে নিয়ম ভেঙ্গেও পার পেয়ে যায়। ছাড়তো। বল, এ বেলায় কিছু হলো? -সে মনে করেই তো গেলুম। ওদের বাচ্চা ছোঁড়াটা ছোট একটা ভাঙ্গা থালে ওর গ্লাস থেকে ঢেলে কিছু দুধ আমায় খেতে দিল। জানতো ওর সাথেই আমার ভাব। মাঝে মাঝে মুড়ি, মুড়কি, ভাত, মাছের কাটা খেতে দেয় ও। তো যেই মুখের ইঁদুরটা ফেলে ওখানে যাওয়া, সেই না ইঁদুরটি লাফ ঝাপ দিয়ে ওর দুধের গ্লাসটাই ঢেলে ফেলে চম্পট দিল। এর মধো ওর মা এসে আমাকে তো তাড়ালোই, ছোঁড়াটাকেও বেদম মারল। আমি জানালা দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে আবার যখন ফিরে তাকালাম তখন ভেলুটা এসে ডাস্টবিনের হাড্ডি চিবানো রেখে আমাকে তেড়ে আসল। ওকে যতই বললাম, দেখ ভেলু, তোর আগে এ বাড়িতে আমি এসেছি। এ বাড়ির ভাঁড়ার ঘরের চাতালে আমার জন্ম। ও ততই ঘেউ ঘেউ বাড়িয়ে দিতে লাগল। আর আমাকে তাড়িয়ে সীমানার বাইরে আনিয়া ছাড়ল। আমিও তাকে দেখে নেব, ম্যাও ম্যাও। কথাগুলি এক নিঃশ্বাসে বলেই ম্লান হয়ে গেল পুষি। কিছুটা উদাস উদাস ভাব নিয়ে লেজ নেড়ে সোজা বালির ঢিবির উপর চলে গেল। সেখানে সামনের পা দিয়ে উপরের কিছু বালি সরিয়ে ফেলে ওখানে প্রাকৃতিক কার্য সম্পন্ন করল। শেষে আবার তা বালি দিয়ে ঢেকে দিল। পুষি নিজেও বোঝেনা যে, মলত্যাগ করার পর কেন তা আবার ঢাকতে হবে। শুধু পূর্ব পুরুষের আচার বলেই সেখানে যায়। সুতরাং টুসিও ধীরে ধীরে সেদিকে যাত্রা করল। শেষে ঠিকই সেখানে তাকে পাওয়া গেল। পুষি টিলার উপর তারই পছন্দের সে উঁচু ঝোপে বসে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। আস্তে আস্তে পুষির পাশে গিয়ে বসল সে। বলল, জানিস লক্সগু বিড়ালীর তিনটি ছানা হয়েছে। তাই ও ধান্দা বাড়াতে গিয়ে কলেজ ছাত্রদের মেসে ধরা পড়েছে। এ্যায়সা পিটুনি খেয়েছে; দুইদিন নড়াচড়া বন্ধ। পরে আমি আর গুদাম ঘরের বেড়াল বিলু গিয়ে দুইটা ইঁদুর মেরে দিয়ে এলাম ওদের। পুষি ওদিকে না তাকিয়েই বলল, আচ্ছা টুসি আমাদের দুঃখ ঘুচবে কবে বল তো; টুসি বলল; জানি না, তবে ঐ যে বিলু বলল, পশু সভায় হুলো বিড়াল সবাইকে যেতে বলেছে; সেখানে কি যেন সমস্যার সমাধান নিয়ে কথা হবে, ম্যাও। পুষি কথাগুলো শুনলো কিনা বোঝা গেল না। উদাস ছলছল চোখ নিয়ে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। যেন আগামীর কথা ভাবছে সে, মানুষে বিড়ালে চুক্তি হয়েছে। মানুষেরা ইঁদুর মারার সব দায়িত্ব বিড়ালদের হাতে দিয়েছে। আর বিড়ালদের থাকা খাওয়ার ভার নিয়েছে মানুষ। কোন বিড়ালকেই লাঠিপেটা খেতে হচ্ছে না, না খেয়ে থাকতে হচ্ছে না, তাড়া খাওয়ার আতংকও নেই। আচ্ছা টুসি, মানুষেরা এত বড় কিভাবে হল, এত উন্নত আর কেউ নয় কেন? -বা রে মানুষের গোষ্ঠী আছে, একতা আছে, তাই তো তারা এত নিরাপদ। আচ্ছা আমরাও যদি গোষ্ঠী করি, একতা করি.... -হ্যাঁ, হুলো বেড়াল তো তাই করতে বলে। দেখ তুই তো সভায় যাস না, আমি সভায় গিয়েছিলাম একবার। সেখানে সকলেই তাদের সমস্যার কথা খুলে বলে যাতে করে একটা সমাধানের পথ পাওয়া যায়। -ধর, আমরাও কি মানুষের মত পোশাক-আশাক, চশমা-জুতো, শোবার ঘর....... টুসি এমনভাবে হো হো করে হেসে উঠল পুষির বাকি কথাগুলো বোঝাই গেল না। অনেকক্ষণ ধরেই এ হাসি চলল। এর মধ্যে বিকেল দ্রুত গোধুলির পানে ছুটে চলে। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে চারধারে। একটু পরে আকাশ আলো করে উঠে পূর্ণিমার চাঁদ। এ দৃশ্য বড়ই মনোহর! সারা পৃথিবীর ডাঙ্গার প্রানীদের জন্য এ বড় বিমুগ্ধকর। তাক থেকে, কাঁড় থেকে, ভাঁড়ার ঘর থেকে, যার যেখানে বাস সব বিড়ালই খাবার মুখে করে দল বেঁধে বেড়িয়ে আসতে থাকে। গন্তব্য উত্তরের জঙ্গল। পুষি আর টুসি একসাথে এল। দেরী হয়ে গিয়েছে তাদের। ততক্ষণে সভার মাঝামাঝি। কালো মত এক বিড়াল যে কিনা অনেক আগেই শুরু করেছিল একবার ওদের দিকে ফিরে আবার বলতে লাগল, -ম্যাও সভাপতি হুলো বিড়াল মহাশয়, মানুষের তো শুধু দোষ দিলে হবে না আমাদের। আমরা নিজেদের মধ্যেও কামড়া কামড়ি করে মরি, ম্যাও। জবাবে হুলো বিড়াল বলল, - দেখুন আমাদের সম্মান ওদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। অন্য প্রানীদের কাছে আমরা বাঘের মাসি হিসেবে পরিচিত, ম্যাও ম্যাও। একটা সাদা মোটা বিড়াল এবার কথা বলার সুযোগ পেল। যদিও এখনো অনেক বিড়াল সুযোগের অপেক্ষায় হাত উঁচিয়ে আছে। ধলু বেড়াল বলল, -ম্যাও ম্যাও, দেখ আমার দাদীর দাদী জমিদারের ঘরে গিন্নী মা'র আদরে বেশ ভালই ছিল। খাওয়া পড়ার অভাব ছিল না মোটে। একবার জমিদারের বউ আমার দাদীর বিয়েতে প্রচুর মানুষ পর্যন্ত নিমন্ত্রণ করে খাইয়েছিল। প্রথম প্রথম আমরাও বেশ ভালো খেতে পেতাম। গৃহস্থেরা রোজ দুধ মেখে ভাত দিত। ঘরে জায়গা দিত। কোলে করে শুয়ে থাকত। আর এখন। শুধু লাঠি আর লাঠি। লাঠি দিয়ে আপ্যায়ন চলে মশাই! অনাহারে টিকতে না পেরে কিছু বেড়াল তাই মানুষের খাবার চুরি করতে গিয়ে আবার পেঁদানীও খাচ্ছে। কে না জানে, কলেজ ছাত্রদের মেসে উচ্ছিটের হাঁড়িতে মুখ দিতে গিয়েছিল বলে ঐ লঙ্গু নামে বেড়ালীকে তারা বেঁধে পিটিয়েছে............. -ম্যাও ম্যাও, সভ্যগণ দয়া করে সংক্ষেপে অভিযোগ সারুন; এখনো অনেক বিড়াল বন্ধু বলার বাকী রয়ে গেছেন। হুলো বেড়াল সকলকে সতর্ক করে দিলেন। পুষি টুসিকে ফিস ফিস করেজিজ্ঞাসা করছে, -ওই যে ঢিবির উপর খড়ের আসনে বসে আছে বড় ধমকে বিড়ালটি কে রে। টুসিও ফিসফিস করে জবাব দিল, -আরে ওইতো আজকের সভার সম্মানিত সভাপতি হুলো বিড়াল। তারডানপাশে পন্ডিত বেড়াল, বায়ে বৃদ্ধ বেড়াল। এবার দাঁড়াল এক বিজ্ঞ বিড়াল। বুদ্ধিজীবী সুলভ ভঙ্গিতে শুরু করল, -ম্যাও ম্যাও, সম্মানিত সভাপতি ও সুধী.......... সভাপতির সম্ভাষণ শুনে হুলো বিড়াল গাম্ভীর্যের সাথে মাথা নাড়লো। সাথে সাথে অসতর্কতায় তার গলার ঘন্টাটি বেজে উঠল। ফলে সবাই বুঝে নিল সভার বিরতি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবাই সবার ব্যক্তিগত আলাপচারিতা সেরে নিল। বিরতির পর বিজ্ঞ বিড়ালটি বলতে লাগল, ম্যাও, দেখুন আমরা মানুষের উপর নির্ভরশীল প্রাণী। কারন আমরা চাষবাস করি না। বৃষ্টি হলে ভিজি। ঘর তো দূর অস্ত, একটা ছাতা পর্যন্ত বানাতে পারি না। কিন্তু মানুষের সাথে আমাদের কোন চুক্তি নেই। মানুষেরা আমাদের যা খেতে দেয় তাই আমাদের জোটে। আমি খাটের নীচে বসে এক ঘরে শুনলাম, এখন মানুষেরাই নাকি ঠিকমত খেতে পায় না। চালের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়, তাও পাওয়া যায় না। কিছু মুনাফালোভী শয়তান ব্যবসায়ী মানুষের জন্য কোটি কোটি সাধারণ মানুষ অর্ধাহারে অনাহারে থাকছে, আবার না খেয়েও মরছে। সরকার থুটো জগন্নাথ হয়ে শ্রেফ চোখ বন্ধ করে বসে আছে, ম্যাও ম্যাও। এবার এক বিক্ষুব্ধ বেড়াল উত্তেজিত হয়ে বলল, -ম্যাও, মানুষ এত ভালো আর উন্নত হলে নিজেরা পশুদের মত মারামারি কাটাকাটি করে কেন? আবার শুনি বোমা মেরে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে। আমরাতো এত নিষ্ঠুর কাজ করিনি, এসবকে ঘৃনা করি আমরা। কিছুক্ষণ সবাই চুপ। মৌণতা ভঙ্গ করে পন্ডিত বেড়াল বলে উঠে বলল, -দেখুন আপনাদের সকলের কথাতেই পর্যুদস্ত বিড়াল জাতির বিভিন্ন সমস্যার চিত্র ফুটে উঠেছে। কথাগুলো ঠিকই। কিন্তু পাশাপাশি অন্য রাজ্যের বিড়ালদের কথা ভাবুন। তারা আরও আতংকে দিনাতিপাত করছে। কোরিয়া দেশের মানুষেরা মাছের মত কুকুর বিড়ালকেও কেটে সিদ্ধ করে খায়। ভাগ্যিস এটা বাঙালি রাজ্য। এরা কুকুর বিড়াল দিয়ে আহার সারে না। তাই রক্ষে। বয়স্ক বিড়াল হাত উঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, -রক্ষেটা আর বেশিদিন থাকবে না। তার কারন আগে মাছে-ভাতে বাঙালি বলা হতো। আজ আর বাঙালির ঘরে মাছের কাঁটা নেই। চুলোয় পর্যন্ত হাড়িচড়ে না অনেকের। দেশে চাল-ডাল-তেল-নুনের দাম যে হারে বেড়ে চলেছে কদিন পর বিড়াল শিকারে বেরুতে আর বাকি নেই। সেদিন পর্যন্ত রক্ষে আর কি.... পুষি মাথায় হাত দিয়ে টুসির দিকে তাকিয়ে বলে, -আরেব্বাস! বলে কি!! এখনো অসংখ্য বিড়াল হাত উঠিয়ে লেজ নেড়ে চলেছে। কিন্তু সবার বলার সুযোগ হবে কিনা এখনো নিশ্চিত নয়। সভাপতি হুলো বেড়াল গলদঘর্ম, কাকে রেখে কাকে বলতে দিবেন এই ভেবে। এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিড়াল বাকী রয়ে গেছে। পুষি আর টুসি ফিসফিস করে পর¯পরের আলাপ সেরে নিচ্ছে। এর মধ্যে বেড়ালদের ৪ দফা দাবিনামা নিয়ে হুলস্থুল তর্ক বেঁধে গিয়েছে। কেউ কেউ তার নিজস্ব মতামত ও নতুন দাবি অর্ন্তভূক্ত করার জন্য বিকট স্বরে ম্যাও ম্যাও করছে, আর এলোপাথাড়ি লেজ নাড়ছে। খাদ্য, বাসগৃহ, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার -এই ৪ দফার পাশাপাশি স্কুল-কলেজ ও লাইব্রেরির দাবিও উঠে এসেছে। কেউ কেউ রঙিন জামা, কাপড়, জুতা, সংগীত ও খেলাধুলার দাবী নিয়ে তুমুল হৈ চৈ শুরু করে দিয়েছে। কোন বিড়াল আবার বিদেশ ভ্রমণের উপর জোর দিয়ে যাচ্ছে। এই শোরগোলের মধ্যে থেকে হঠাৎ একজন শ্লোগান তুলে বসল, “বিড়াল ভায়া, ম্যাও ম্যাও।” তার অনুগতরা বলল, “এক হও, ম্যাও ম্যাও।” এরপর ক্রমান্বয়ে “অধিকার, ম্যাও ম্যাও/ মর্যাদা, ম্যাও ম্যাও।” থামুন, থামুন, এক ধীর স্থির পাহাড়ী বেড়ালকে উঠে দাঁড়াতে দেখা গেল। এবং তার কথায় কাজও হলো। শোরগোলটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে থাকল। পিনপতন নীরবতা। জনতার উদ্দেশ্যে তার শান্ত শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে বলে চলল, -দেখুন, এসব এভাবে কিচ্ছু হবে না। কি বলবেন, মানুষেরা মিটিং, মিছিল ও জনসভা করে। সেগুলো তাদের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার। কিন্তু তাদের এ জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। সমাজ পাল্টাতে হয়েছে। এভাবে নিজেদের রাজ্যও গড়ে তুলেছে তারা। আমাদের সকল অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদেরও তদ্রুপ বিড়াল-রাজ্য গড়ার বিকল্প নেই।' কথাটা শুনে নড়ে চড়ে বসল পুরো বিড়াল সভা। পাহাড়ী বিড়াল বলতে লাগল, - মানুষের সভ্য হয়ে উঠার একটা ইতিহাস আছে। এই যে এক বিড়াল ভায়া বলল, কাটাকাটি করে খুনোখুনি করে, কিছু লোভী মানুষের জন্য বহু মানুষ ঠিকমত খেতে পায়না, না খেয়ে মরে-এ কথা যেমনি ঠিক। তার বিপরীতে মানুষ একবার যুদ্ধহীন ক্ষুধাহীন শান্তিময় এক রাজ্য গড়ে তুলেছিল রাশিয়া নামের এক দেশে। সেই সুন্দর সমাজের নাম তারা দিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক সমাজ। পুরাতন দুঃখ কষ্টের সমাজ ভেঙ্গে সেখানে তারা এক আশ্চর্য মানবিক সমাজ গড়েছিল। এখনও দেশে-দেশে ঐ রকম সমাজ গড়ার জন্য মানুষ দল বাঁধছে। এ কথা শুনে সকলে স্তস্তিত হয়ে গেল। একটু থেমে আবার বলতে আরম্ভ করল শান্ত পাহাড়ী বিড়ালটি, -ভাবছেন এসব কথা আমি কোথায় শিখেছি? স্বাভাবিকভাবে এসব প্রশ্ন আসতেই পারে। তবে জেনে রাখুন, এক রাখাইন পন্ডিতের ঘরে থাকতাম আমি। তার বই পড়া আমি লুকিয়ে লুকিয়ে শুনতাম জানালার শার্শির ধারে। মানুষ কি করে এল, সভ্যতা কি করে হলো, জানা অজানা কত্ত কিছু ছিল তার বইয়ে! পাহাড় ধ্বসে তার পুরো পরিবারসহ সকলে মৃত্যুবরনের আগে বেশ আদরেই ছিলাম ওখানে। খানিক দম নিয়ে শান্ত সুরে বলল, -দেখুন ভায়া আসল কথা হল, আমরা চাষবাস করতে জানিনা। পাহাড়ী বিড়ালদের তাও শিকারের হাত আছে। মানুষও একদিন বনে জঙ্গলে আমাদের মত প্রকৃতির মুখাপেক্ষী ছিল। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তারা তাদের সভ্যতা নির্মাণ করে চলেছে..........’ টুসির খানিকটা ঘুম পেয়েছিল মাঝখানে। তাই সে পিঠ উঁচু করে বিড়ালদের সেই সচরাচর ব্যায়ামটা সেরে নিল। পুষিও সামনের দুপা সটান করে মেলে তার প্রিয় আলসেমী দূর করার ব্যায়ামটা করে নিল। সবাই মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছে। এমন মূহুর্তে একজন খবর নিয়ে এল লঙ্গু বিড়ালী মারা গেছে। সাথে সাথে সভায় শোক প্রস্তাব উত্থাপিত হল। লেজ নামিয়ে এবং কিছুক্ষণ নীরব থেকে লক্সগু বিড়ালীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানানো হলো। সে সময় কেউ লক্ষ্যই করেনি কখন কোন ফাঁকে যে ভেলু নামে কুকুরটা চুপিচুপি তার বাহিনী নিয়ে সভাস্থলের পাশে ওত পেতে বসে আছে। যখন দেখল তখন বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ ভেলু গগণবিদারী ঘেউ ঘেউ শব্দে যুদ্ধ ঘোষণা করল। হুড়মুড় করে তৎক্ষণাৎ যে যেদিকে পারল ছুটে পালাতে লাগল। এবার সশব্দে পুরো ভেলু বাহিনী অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পরল। মূহুর্তের মধ্যে জঙ্গল রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। আর্ত চিৎকারে ভরে উঠল জন্তুদের এ জংলী সভার ময়দান। রক্ত আর লাশের মাঝখান দিয়ে প্রাণ নিয়ে ছুটে পালাতে লাগল পুষি আর টুসি। হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে শেষে পুষি এক সময় টিলার সেই উঁচু স্থানটায় গিয়ে পৌঁছে বেশ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগল। মাথা থেকে কপাল বেয়ে তখনও রক্ত ঝরছিল ওর। ব্যাথায়-ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো বুজে আসতে থাকে ক্রমশঃ। রাজ্যের ঘুম এসে ভর করল তার চোখে। ঝাপসা চোখে খুব কষ্ট হচ্ছে সামনের টিলার দিকে তাকাতে। নীচে টুসির মৃতদেহ ছিটকে পড়ে আছে। বেচারা বোধ হয় দৌড়ের ঝোঁক সামলাতে পারেনি। পুষি আর কিছুই ভাবতে পারছে না। তার শরীর নিথর অসার হয়ে আসছে। বুজে আসছে চোখ দুটি। কানে বেজে যাচ্ছে অজস্র হৈ হট্টগোল, কুকুরের হুংকার, বেড়ালের আর্তনাদ; সবকিছুকে ছাপিয়ে সেই শান্ত পাহাড়ী বিড়ালের স্বপ্নময় বক্তব্য। আর মাঝে সুনসান নীরবতা। .......এক ভিন্ন রাজ্যে এসে পড়ে পুষি। সেখানে রঙিন কাপড় পরা বেড়ালেরা কর্মব্যস্ততা সেরে বাড়ী ফিরছে। কোট, টাই, চশমা পড়া অগণিত বেড়াল বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের হাতে বাচ্চাদের খেলনা, দুধ, দৈনিক সংবাদপত্র। গাড়ী নিয়ে আসে মাথায় সাদা ক্যাপ পরা কালো বিড়াল। ম্যাও ম্যাও করে অন্য বিড়াল যাত্রীদের ডেকে যাচ্ছে। মাঝ রাস্তায় প্লাজমা টিভির বিশাল পর্দায় ভেসে আসছে এক সুরেলা কণ্ঠী বিড়াল ...... ‘বিড়াল রাজ্যে স্বাগতম... বিকেল ৬টার গোধূলীর সংবাদ...বিড়ালদের জন্য ভিসামুক্ত বিশ্বে এই প্রথম পদার্পণ...পরক্ষণেই বিড়াল রাজ্যের নেতা সেই পাহাড়ী শান্ত বিড়ালের হাসিমুখ ভেসে উঠল পর্দাজুড়ে। তার কণ্ঠের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ছে দেশ জুড়ে, ... বিড়াল রাজ্য দীর্ঘজীবী হোক... আজ নতুন সভ্যতার উন্মেষে চাষাবাদ আর পশুপালন যুগের সুচনা...’। গোধূলির আকাশ একটা অদ্ভুত রং ধরেছে আজ। চারিদিকে বইছে মুদুমন্দ হাওয়া। এমন মধুময় প্রকৃতি বহুদিন দেখা যায়নি।
← Back to All Articles
Click to Chat