বিধু ভুষন নাথ
’যমানন্দ’ স্যারের বেতের ভয়ে কাঁপছে পুরো ক্লাস । পড়া না শিখে আসা ছাত্রদের বুকে অনবরত টিক টিক করে বেজে যাচ্ছে ঘড়ির কাটার প্রতিটি সেকেন্ড। আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে যখন নিঃশব্দে পালানোর মতলব করছে ক্লাসের নামকরা পড়া-ফাঁকিবাজ ফালতু, স্যার তখন ব্ল্যাকবোর্ডে। আর ড্রেস না পরে আসা ছাত্ররা যে যার জায়গায় কানে হাত ধরে দাঁড়িয়ে, চূড়ান্ত শাস্তির অপেক্ষায়। সবাই উদ্বিগ্নতা নিয়ে একবার ওর পালানোর দিকে একবার স্যারের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে। টেবিল থেকে দরজার দিকে অর্ধেকের বেশী পথ অতিক্রমের পর হঠাৎ যমানন্দ স্যার ১৮০ ডিগ্রী কোনে ঘুরে গেলেন। আর যায় কোথা! স্যারের চোখে চোখ পড়তেই ফালতু সাক্ষাৎ মূর্তি বনে গেল। ক্লাসের অধিকাংশরাই তখন চোখ বন্ধ করে ফেলল। আর অনুভব করতে লাগল কানের ভেতর দিয়ে আসা বেতের ঠাস ঠাস শব্দরাশি।
তপুর অবশ্য এসবের দিকে তেমন মনোযোগ নেই। সে ভাবছে অন্য বিষয়-কেন জীবনভর ঝড়- বৃষ্টিতে ভিজেও গাছেদের সর্দি হয় না। আর কেনইবা কাক বা পক্ষীদের জীবনে কোনদিন হাঁচি দিতে শোনা যায় না। বেশ কিছুদিন হলো এ বিষয়টা ওর মনে তোলপাড় খেলে যাচ্ছে। ওহ ভাল কথা! তোমরা তপুকে চিনতে পারছো তো? ঐ যে মনে নেই চেয়ার-টেবিল-খাট, পড়ার ঘরের সবকিছু ওর সাথে কথা বলে। বেশ মজার আড্ডা করে। ওদের সব কথাই বুঝতে পারে সে। তপু এদ্দিনে একটু বড় হয়েছে। ইতিমধ্যে ক্লাসঘরের চক-ডাস্টার-টুল-টেবিল-চেয়ার-বেত এমনকি জানালার শার্সি সবার সাথেই ওর ভাব হয়ে গেছে। এই যে বেতটা একটু আগে আক্ষেপের সঙ্গে বলেই ফেলল, ’ইচ্ছা হয় আত্মহত্যা করি। এই যমানন্দ বাবুর কবল থেকে যমলোকে যাওয়াও অনেক ভাল। সরষের তেল মাখাবে, রোদে দেবে, এরপর ছোকরাদের মাথায় ভাঙ্গবে। আর আমার বারোটা বাজাবে।’ একথা শুনে তপু বলল, ’ওরা পড়া শেখেনা যে..।’ তাচ্ছিল্যস্বরে বেত প্রতি উত্তর করল, ’কেনরে বাপু-ধমক মারা, অপমান করা, শাস্তি দেয়া এসব ছাড়া দিব্যি শিক্ষ্যে হচ্ছে ভিনদেশে। এরচে’ ঢের ভাল শিক্ষ্যে। তো সেই পদ্ধতি বার করতে পারনি ! শুধু শুধু ছোকরাদের উপর হম্বিতম্বি। এ যেন প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি, হাত-পা বেঁধে অপারেশনের যুগ চলছে।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলছে আর হাঁপাচ্ছে। কথাগুলো শুনে তপু একটু আনমনা হয়ে বলল, হুম। বেত সুযোগ পেয়ে আবার বলতে লাগল, ’আর এই ছেলেটারও বলিহারি। দরজাটা পই পই করে বললে তাড়াতাড়ি কেটে পড়তে, দরকার হলে সে তার অভ্যাসবশতঃ খটখট শব্দ করবে না- তবুও শুনলে না। এবার মর। ধরা পড়ে তোমার সাথে আমারও জান শেষ।’ এবার তপু বিরক্ত হয়ে বলল, ’চুপ কর। ক’দিন পালাবে। পরের দিনই আবার ঠেঙ্গাবে।’ বলেই সে আরো ভাবনায় তলিয়ে গেল। তার মধ্যে একটা হলো, রাতের বেলায় চাঁদ কিংবা তারার দিকে তাকালেই দেখা যায় এরা মানুষের সাথে সাথে হাঁটে। কারনটা বের করার জন্য অনেকক্ষণ ধরে ভাবল সে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই জানালার শার্সি আর শিকগুলো সতর্ক করে দিল, তপু ভাই ভেতরে তাকাও। অবস্থা তেমন সুবিধের নয়। এর সাথে টুল ও টেবিল সায় দিয়ে বলল, ”গালের থেকে হাত নামিয়ে সোজা হয়ে বোস। না হলে ঐ দেখছো ফালতুর মত অবস্থা হবে বলে দিচ্ছি। একি! টেবিলে আঁকাআঁকি কর না প্লিজ। একটা বই বলে উঠল, আমার পাতা খুলে পড়াগুলো চট করে রিভিশন দিয়ে দাও দিকিনি। না হলে একটু পরে বুঝবে মজা। তপু হাঁপিয়ে উঠে বলল কি চাপ রে বাবা, একেবারে জেলখানা। বেত বেটাই ঠিক বলেছে। একথা শুনে কলমটা খানিকটা লাফিয়ে উঠার ভঙ্গিতে বলল, ”আমিও জানি” তপু আশ্চর্য হয়ে তাকালো পকেটে রাখা সবুজ কলমটার দিকে। বলল, ”কি জানো?” কলম ঝটপট জবাব দেয়, ”ঐ যে আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা।” সাথে সাথে বাংলা বইও তাঁর স্বভাবসুলভ গুরুগম্ভীর ভঙ্গীতে বলে ওঠে,.. অ্যা, ইয়ে... কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একথা বলেছেন। তপু এবার কানে হাত দিয়ে বললে, তোমরা সবাই চুপ করবে, দয়া করে। সবাই চুপসে গিয়ে যার যার মত পিছু হটছে আর ম্লান হাসি হেসে বিড়বিড় করছে, না আমি বেশি কিছু বলতে চাইনি, ইয়ে ...মানে বিশেষ কিছু নয়। এদিকটায় আবার ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বেশী বিজ্ঞানী নাকি বেশী ভাষাবিদ ছিলেন, এটা নিয়ে ব্যাকরণ আর বিজ্ঞান বইয়ের মধ্যে শুরু হল তুমুল কথা কাটাকাটি। সমাজ বই এলো মধ্যস্থতা করতে। এ বিতর্ক শেষ হতে না হতে ধর্ম আর ভূগোল বইয়ের মধ্যে লেগে গেল মহাবিতর্ক। প্রসঙ্গ বৃষ্টির কারণ। একজন বলছে বৃষ্টি মিকাইল ফেরেস্তা এবং ইন্দ্র দেবতার কাজ। অন্যজন এর বিরোধিতা করে বর্ণনা করে যাচ্ছে জলাশয় থেকে উত্তাপে কিভাবে মেঘ, বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুৎ তৈরি হয়। কেউ কারো কথা শুনছে না।
এরই মাঝে একটু ভিন্নরকম চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তপু কান পেতে মনোযোগ দিতেই শুনতে পেল, এক মেইন বই গাইড বইকে বলছে, দুরে হট। গাইড বই পাত্তা দিচ্ছে না। সেও সমানে বলে যাচ্ছে, দেখ, আমাকেও একটু সম্মান-টম্মান দিও, আমি তোমার চেয়ে মোটা, ভারী, দামেও বেশী। গম্ভীরস্বরে মেইন বই বলল, এখন সৃজনশীল পদ্ধতির যুগ, জাননা তুমি? শুধু ৩টি শ্লোগান- মুখস্ত না, কোচিং না, গাইড বই না। সুতরাং তুমি আর স্কুলে এসো না। তোমার সাথে গা ঘেঁষাঘেষি করে থাকতে আমার ইজ্জতে বাঁধে। মুখ ভেংচিয়ে গাইড বইটি জবাব দেয়, আরে রাখ, ঢং। তোমার ঐ ৩ ’না’ নানা বাড়িতে বেড়াতে গেছে, জাননা ! শোন, ওগুলো এখন আগের চেয়ে বেশী পাকাপোক্ত। স্কুলেই এখন অর্ধেক ক্লাস আর অর্ধেক কোচিং চলে। দরকারি বে- দরকারি পরীক্ষার চাপে ছেলে-মেয়েরা দমবন্ধ করে গাইড বই গিলছে। বরং এখন একটার বদলে অনেকগুলো। এখন শুধু ৩টি শ্লোগান- মুখস্ত হ্যাঁ, কোচিং হ্যাঁ, গাইডবই হ্যাঁ, হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ !!! সুতরাং তুমি আর স্কুলে না এলেও চলবে। বড়ত্ব নিয়ে ঘরে বসে থাকো।..........
হঠাৎ টেবিলে ঠুসঠাস ডাস্টার পেটানোর শব্দে সকলেই স্তব্ধ। যমানন্দ স্যার নাকের থেকে চশমাটা চোখে তুলে বললেন, অ্যাটেনশন, আই সে অ্যাটেনশন!
ডাস্টার আর টেবিল যখন- মাজা গেল, হাঁড় গেল বলে চিৎকার করছে ব্ল্যাকবোর্ডটা তখন চকের লেখাগুলোকে দাঁত বানিয়ে মিটিমিটি হাসছে। তৎক্ষনাৎ তপুর মাথার মধ্যে এক বুদ্ধি খেলে গেল। সে খাতা খুলে চট করে এক কোরাস লিখে ফেলল। চুপিচুপি বই-টেবিল-বেঞ্চ-চক- ডাস্টারসহ সকলকে সুর ধরতে বললে সকলে সায় দিল তাতে। ঐক্যতানে পর¯পরের ভেদাভেদ ভুলে গাইতে শুরু করল। মাইল্ড ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে গাইলও দারুণ-
ওহ্ যম-আনন্দ স্যার, ও যমানন্দ স্যার
আস্তে ধরুন, আস্তে মারুন
আস্তে করুন চিৎকার। ঐ
ওহ্ যম-আনন্দ স্যার, ও যমানন্দ স্যার
প্রাণ যে যায়, কি করি হায়
শুনে বিরাট হুংকার। ঐ
ওহ্ যম+আনন্দ স্যার, ও স্যার
যম-টাকে বাদ দিন, আনন্দ-কে রেখে দিন
শিক্ষাটা হোক এক উপভোগের ব্যাপার। ঐ
.................. জড় পদার্থগুলোর সংগীতে মেটাল, ড্রাম আর গীটারে সুরের মুর্ছনায় বইগুলো সব ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। জ্যামিতি বক্সের কাটা কম্পাস, পেন্সিল কম্পাস ’পার্টি ড্যান্স’-এর তালে তালে সাদা খাতায় বৃত্ত আঁকতে শুরু করে দিল। পুরো ক্লাস অভিভূত। কোত্থেকে এই নিম্ন কম্পাংকের শব্দ তরঙ্গ ভেসে আসছে!! কানধরা, একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা, শান্তির জন্য অপেক্ষা করা ছাত্রদের মনে যে ত্রাহি ত্রাহি রব ছিল এক নিমিষে তা কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। একি! মাথা নাড়তে নাড়তে যমানন্দ স্যার স্বয়ং চেয়ারে বসে সুর ভাঁজছেন। এদৃশ্য দেখে তপুর চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ল একটুকরো মিষ্টি হাসির ঝলক।
তবে বেশীক্ষণ স্থায়ী হয়নি এর রেশ। যমানন্দ স্যারের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেল তপু। হুংকার ছেড়ে তিনি বলছেন, ”এদিকে আয় তপু। ভালকথা, তোর সাথে হোমটাস্কের খাতাটাও নিয়ে আয়। দেখি এতক্ষণ বসে বসে কি এতো মনোযোগ দিয়ে লিখেছিস তাতে !!!!!!.............
← Back to All Articles