· Civil

তপুর পড়ার ঘর

আশ্চর্য ক্ষমতাসম্পন্ন এক বিস্ময় বালকের যাদুকরি গল্প

তপুর পড়ার ঘর
বিধু ভূষন নাথ পলাশ ইয়া-লম্বা হাই তুলে হাত-পা টান টান করে চোখে মুখে আলস্য ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল ভোরের সূর্য। শুরু হলো আরেকটি দিন। এল আরো এক সুন্দর প্রভাত। পাখিরা গেয়ে যাচ্ছে ’গল্প হলেও সত্যি’ সিনেমার সেই বিখ্যাত গান-“শুক বলে উঠো সারি ঘুমাইওনা আর/এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার”......। ভোরের রং মেখে ঝিরি ঝিরি হাওয়া গা ধুইয়ে দিচ্ছে পুরো প্রকৃতি রাজ্যকে । মা এসে ঘুমন্ত তপুকে গালে চুমু খেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ো ’ওঠো সোনা’ বলতে বলতে জানালা খুলে দিয়ে চলে গেল। এলার্ম দেয়া টেবিল ঘড়িটা তারস্বরে জাগরনী সংগীত বাজিয়ে যাচ্ছে। তপু হাই তুলে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে চোখে রগড়াতে রগড়াতে উঠে বসল। এরপর টেবিল হাতড়ে হাতড়ে ঘড়ির এলার্মের চাবিটা বন্ধ করে প্রতিদিনের মতো প্রায় চোখ বুজেই বাথরুমের দিকে রওনা হলো। ফিস ফিস করে কে একজন বলল, দেখিস আজকেও আবার...........। বলতে না বলতেই- ধপাস!! আরেক পক্ষ ফিক করে হেসে বলল, এ-তো নিত্যই ঘটছে। তপু ধুলো ঝেড়ে উঠে চেয়ারটাকে ঠিক জায়গায় রাখল। এ সময় যেন কারো কথার শব্দ কানে এল। কিন্তু পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। মা রান্না ঘর থেকে হাঁক দিল, ”কিরে আজও পড়েছিস চেয়ার নিয়ে? লেগেছে?” ”না মা, আমি ঠিক আছি” চিৎকার করে কথাগুলো বলতে বলতেই বাথরুমে ঢুকে পড়ল। এবার চোখ বুজে নয়, বড় বড় চোখ করে, লম্বা লম্বা পায়ে। তখন সমস্ত ঘর বিচিত্র সাংকেতিক শব্দে মুখর হয়ে উঠল। ”দেখলেন, দেখলেন, টেবিল মশায়- রোজই ঐ এক হাঙ্গামা; ভাললাগে বলুন? রাতে মশারি খাটাতে গিয়ে আমাকে মাঝে রাখবে আর প্রতি সকালে জড়িয়ে জড়িয়ে পড়বে। যাও বাঁচতুম কিছুদিন তাও বোধ হয় হচ্ছে না। এদিকটায় আমার ডান পা টায় আবার ঘুন ধরেছে।” আফসোসের ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে একটু সহানুভূতি আশা করল চেয়ার চং! ফল উল্টো হলো। কিছুক্ষন চুপ করে তাকিয়ে থেকে টেবিল বলল, ”দেখুন আপনাকে কতদিন বলব টেবিল মশায়- টেবিল মশায় করবেন না, ওসব মশায়-টশায় আমার ভাললাগে না; আমাকে ডাকবেন ’মি. টিল’ বলে। এ ছোট কথাটিও মনে থাকেনা আপনার! শেষ পর্যায়ে একটু রেগে গেছে দেখে চং অতি কোমল কন্ঠে বলল, ”ঠিক আছে, ঠিক আছে, ভুল হয়ে গেছে। ক্ষমা চাইছি মি. টিল, আর হবে না।” কথার খেই ধরে আবার বলল, ”দেখুন, প্রতিদিন টানাটানি, ঠেলাঠেলি, ঠাস করে পড়ে যাওয়া, তারপরে ঘুনের অত্যাচার.... মাথা কি আর ঠিক রেখে সবকিছু মনে রাখা যায়? এখন আবার শুনি ঘরের চুলায় গ্যাস থাকে না বলে মা- ঠান পরানের মাকে দিয়ে নতুন মাটির চুলা গড়িয়েছে। কবে যে আমার ঠ্যাং ধরে উনুনে নিয়ে যায়, সে চিন্তায় প্রেসারটাও বেড়ে গেছে।” এবার টেবিলের মন গললো। বলল, ”না ঠিক আছে, দুঃখ করোনা খারাপ কাঠের চেয়ার করতে নেই। করলেই বা ঠিকমত পালিশ, বার্নিশ, যত্ন-আত্তি না করলে তো চেয়ার টিকবে না। তোমার কি দোষ। তুমি তো আর হেঁটে হেঁটে কাঠের মিস্ত্রীর দোকানে যেতে পারবে না চং।” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আবার যোগ করল, ’দেখছো তো কতদিন হলো আমার গায়ের ক্লথ ছিঁড়ে ফালি। ছোড়াটা জ্যামিতি, সম্পাদ্য, উপপাদ্য, যোগ-বিয়োগ, ছড়া লিখে, ফুল, পাখি, প্রজাপতি হিজিবিজি এঁকে আমাকে প্রত্নতত্ত্বের মডেল করে ছেড়েছে। গিন্নী মা টেবিল ক্লথের কথা বললেই কর্তাবাবুর সে এক কথা- ’আপিস ছুটির পরে কাজ ছিল, মনে নেই; আগামীকাল হবে খন’ । ঐ আগামীকাল আর আসেনা।” এমন সময় বাথরুমের ভিতর থেকে শাওয়ার ছাড়ার আর গানের শব্দ ভেসে আসে।’ ....অনুভব কর ইট-কাঠ-পাথর সব বলতে পারে কথা। অনুভব কর...। এতদিনে গানটা পড়ার ঘরের সব আসবাবপত্রের মুখস্ত হয়ে গেছে। তাই আলনা আর বুকসেলফটা পরের দু’লাইন গেয়ে উঠল-’... এ এক অন্য জগতে অন্য আকাশে মিলি আমরা, অনুভব কর...’। ক্রমান্বয়ে একুরিয়াম আর গোল্ডফিস গুলোও সুর ভাঁজছে পরের লাইন গুলোতে ’... অনুভব কর, ফুল-পাখি-নদী-পাহাড়- গাছ-সবুজ মাঠ একই সুরে গাইছে গান। অনুভব কর.....’। এরপর দক্ষিণের জানালাটাও ক্র্যাক ক্র্যাক করে সুর ধরে .... হৃদয় দিয়ে অনুভব কর, আনন্দের হাওয়ায় উড়ো, ছাড়ো মন খারাপের বধ্যভূমি। অনুভব কর...’। পুরো পড়ার ঘর ঐক্যতানে সুর তুলল, অনুভব কর... অনুভব কর.....। সব যখন উত্তুঙ্গে তখন বাথরুমের পাশে জুতোর সেলফ চিৎকার করে বলল, চুপ ! চুপ সবাই! আসছে! দরজা খুলে বের হয়ে তপু চারিদিকটা ভাল করে তাকাল। একটা অস্বাভাবিক স্তব্ধতা অনুভব করল সে। ওর অনেক দিন ধরেই মনে হচ্ছে, পড়ার ঘরে অজান্তে কিছু একটা ঘটে যাচ্ছে। মাকে একদিন বলল, তার ঘরের আসবাবগুলো নিজেদের মধ্যে নানা কথা বার্তা বলে। শুনে মা তো হেসে কুটি কুটি। মা বলে, ”দেখ বাছা, জড় পদার্থের ভাষা আবিস্কার করতে পার কিনা... আমার আবিস্কারক ছেলে!!” তপু স্কুলে যাবার পরপরই আবার জমে ওঠে আসবাবদের যাবতীয় আলাপচারিতা। কথায় কথায় চং জিজ্ঞেস করে, ”আচ্ছা মি.টিল আপনার নামের মাঝখানের ব অক্ষরটা বাদ দিলেন কেন? ব দিয়ে বদ, বাজে, বদমাশ-দুনিয়ার তাবৎ খারাপ শব্দ বাঁধা হয়”-টিলের ঝটপট জবাব। এরকম কথা আরো কতক্ষন চলত তা বলা সম্ভব ছিল না যদি না স্কুল থেকে তপু এসে পড়ত মাঝখানটায়। তপু এসেই ফুলসমেত একটা ফুলদানী টেবিলের উপর এনে রাখে। ফুলের গন্ধে সারা ঘর মৌ মৌ করতে লাগল। টেবিল টিল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে, ”গন্ধটা বেশ ভাল, কিন্তু ফুলদানীটা একটু আস্তে রাখলেই তো পার, জান না ব্যাথা লাগে।” তপু চমকে উঠে বলল, ”কি.....কে?” বলেই এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। টিল বিরক্তি মাখা সুরে বলল, ”তপু,আমি তোমার পড়ার টেবিল মি.টিল।” তপু অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। আনমনে বলল, ”কিন্তু’ টেবিল যে কথা বলতে পারে, এমন তো শুনিনি আগে কখনো !” টিল একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ”হা ভাগ্য,আচ্ছা পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। তুমি যে চেয়ারটায় বসে আছ তার নাম হচ্ছে চং; ইনফ্যাক্ট আমারই দেয়া নাম।” সাথে সাথে চং হেসে বলে উঠল, ”সুপ্রভাত তপু, কিন্তু মশারি খাটাবার পর আমাকে জায়গা মত রাখলে তুমিও রোজ হোঁচট খাবে না,আমার ও আয়ু কমবে না।” তপু তৎক্ষনাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। বিছানায় গিয়ে বসে ভাবতে লাগল, একি হচ্ছে সব! বাকী আসবাবরা এর মাঝে ভাবতে শুরু করে দিয়েছে, কি বলা যায়। নানান কথা উকি মারছে তাদের মনে । কট কট করে উঠল খাট। বলে উঠল, ”তপু এখানটায় বোস না প্লিজ, একটু ভাঙা আছে। আরেকটু সরে বোসো।” চমকে দাঁড়িয়ে গেল অপু। এবার খাট আরো নরম সরে বলল, ”আহাহা রাগ কোর না, বা-দিকটায় বসো; তবে কাঠমিস্ত্রিকে দয়া করে খবর দিও যাতে সে এসে আমার ডানদিকের পাঁজরটা সারিয়ে দিয়ে যায়।” এবার চেয়ারে গিয়ে বসল তপু। সামনে পেয়ে টেবিল মিঃ আবার কথা তুলল। এবার আর তপু চমকে গেল না। টিল বলল, ”দেখ সুন্দর খোকা, আমার উপর এসব যোগ বিয়োগ গুন ভাগ অংক আর আঁকিবুকি কোর না, কেমন ? তাহলে কত সুন্দর দেখাবে আমায়, তখন তোমারও পড়তে ভাল লাগবে। আর মাকে বলে একটি ভাল টেবিল ক্লথ এনো।” ক্রমান্বয়ে পুরো পড়ার ঘরে আজ যেন কথার আগল খুলে গেল। অবশ্য এর জন্য মি. টিলকে ধন্যবাদ দিল সকলে। এক ফাঁকে আলনা বলে উঠল, ”স্কুল থেকে এসে জামা কাপড়গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে না রেখে আমার উপর সুন্দর করে গুছিয়ে রেখো। এরকম করে রাখলে দম বন্ধ হয়ে আসে, আমার ভাল ছেলে তপু।” ঘরের মেঝে একটু রুক্ষ স্বরেই বলল, ”ছেঁড়া কাগজপত্র ঝুড়িতে ফেলতে হয় তপু।” বুক সেলফ একটু মাথা খাটিয়ে বলল, ”আমার তাকগুলো পরিস্কার করে রেখো। সিরিয়াল ঠিক রেখে বইপত্তর নিয়ো।” বিছানাও সুযোগ ছাড়বে কেন। সে বলে উঠল, ”ঘুম থেকে উঠে আমাকে একটু সুন্দর করে গুছিয়ে রোখো তপু; বালিশ,ওয়াড়, বেড সিটটা যেন পরিপাটি থাকে। তাহলে মায়ের কষ্ট কম হবে। ঘুম থেকে ওঠার পরই মশারিটা তুলে ফেলবে লক্ষীসোনা।” জুতোর সেলফটা এতক্ষন ভাবছিল কি বলা যায়। একটু ভেবে বলল, ”জুতোগুলো এদিক সেদিক ছড়িয়ে থাকলে জানতো ঘর ময়লা হয়, কষ্ট করে আমার তাকে উঠিয়ে রেখো প্লিজ।” সবার কথা শুনে আর থাকতে না পেরে ফ্যান এবং লাইট সমস্বরে বলে উঠল, "ঘর থেকে বেরেবার সময় আমাদের সুইচগুলো অফ করে যেও দয়া করে। গত মাস থেকে বিদ্যুতের দাম আবার বেড়ে গেছে।” সকলের অভিযোগ উপদেশ শুনে তপু একটু দমে গেল। ”আমি, আমি তো কিছুই ঠিকঠাক করিনা।” বলেই মন খারাপ করে মুখ ফিরিয়ে রইল তপু। তখন টেবিল টিল বলল, ”তপু তুমি একটি চমৎকার ছেলে। কত সুন্দর ছবি আঁক, ছড়া বল, গান কর। আমরা সবাই তোমার বন্ধু। তোমার গানটাও আমরা শিখে ফেলেছি।” সাথে সাথে সব আসবাব সমসুরে গেয়ে উঠল-অনুভব কর, অনুভব কর, আমরা যদি থাকি সচেতন, দিনগুলি হবে আরো সুন্দর। অনুভব কর......। এদের গান শুনে তপুর মন ভরে গেল। সকাল বেলার রোদ্দুরের মত একটুকরো হাসির ঝিলিক তপুর সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ মায়ের গলার আওয়াজ আসে রান্নাঘর থেকে, ”তপু সোনা খেতে এসো।” ’যাই মা’ বলে পড়ার ঘর থেকে তপু বেরিয়ে আসার মূহূর্তে টেবিল টিল ডেকে উঠল, ”হুউউম বইটা বন্ধ করে চিহ্ন দিয়ে যাও।” একটু হেসে বইটা বন্ধ করে রেখে খেতে গেল তপু। বেরিয়েই শুনতে পাচ্ছে পুরো পড়ার ঘর ঐদিকে গান ধরেছে ঐক্যতানে......অনুভব কর, অনুভব কর.....। ওদের গান শুনে ফুল বাগান থেকে প্রজাপতিরা জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে। তাদের মনের অজান্তেই মুখ ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে...অনুভব কর...আরেকটা সুন্দর দিন, সুর্যের ভোর আসবে আমাদের স্বপ্নগুলো ডানা মেলে উড়বে এক নতুন আকাশে, যাচ্ছে-তাই এ দিনগুলো আর থাকবে না/আনন্দের এ শৈশব আর কাঁদবে না। থাকো এ বিশ্বাসে। অনুভব কর................ অনুভব কর................. ।
← Back to All Articles
Click to Chat